৫৩ বছর পর আবারো চাঁদের পথে মানুষ

দীর্ঘ ৫৩ বছর পর আবারও মানুষকে চাঁদের কক্ষপথে পাঠাতে যাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA)। সর্বশেষ ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ অভিযানের মাধ্যমে চাঁদে নভোচারী পাঠানো হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক মিশনের পর এবারই প্রথম নতুন করে মানুষবাহী মহাকাশযান চাঁদের অভিমুখে যাত্রা করতে যাচ্ছে।

আর্টেমিস-২ মিশনের আওতায় চার নভোচারীকে বহনকারী মহাকাশযানটি চাঁদের কক্ষপথে পাঠানো হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিটের পর ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার (Kennedy Space Center) থেকে এর উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। নাসা জানিয়েছে, আবহাওয়া ও প্রযুক্তিগত বিষয় বিবেচনায় দুই ঘণ্টার একটি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে—সন্ধ্যা ৬টা ২৪ মিনিট থেকে রাত ৮টা ২৪ মিনিটের মধ্যে যেকোনো সময় এটি উৎক্ষেপণ করা হতে পারে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী এটি ভোরের দিকে ঘটতে পারে।

এই ঐতিহাসিক অভিযানে অংশ নিচ্ছেন মার্কিন নভোচারী রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কচ এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। তিন পুরুষ ও এক নারী নভোচারীর এই দল মহাকাশ গবেষণার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন। অভিযানটি ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।

নভোচারীরা যাত্রা করবেন অত্যাধুনিক ‘ওরিয়ন’ ক্রু ক্যাপসুলে, যা গভীর মহাকাশে মানুষের নিরাপদ ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে তৈরি। প্রায় ১০ দিনের এই মিশনে তারা চাঁদের চারপাশে উচ্চগতিতে প্রদক্ষিণ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। যদিও এই মিশনে চাঁদে অবতরণের পরিকল্পনা নেই, তবে এটি এমন এক যাত্রা হবে, যেখানে মানুষ পৃথিবী থেকে এর আগে এত দূরে কখনও যায়নি।

কেনেডি স্পেস সেন্টারে পৌঁছে রিড ওয়াইজম্যান বলেন, এই মুহূর্তের জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করেছে। তাদের দল মহাকাশ যাত্রার জন্য প্রস্তুত এবং উচ্ছ্বসিত।

আর্টেমিস কর্মসূচি নাসার একটি বহু-বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য চাঁদে মানুষের স্থায়ী উপস্থিতি গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে মানুষ পাঠানোর পথ তৈরি করা। আর্টেমিস-২ এই কর্মসূচির প্রথম মানববাহী মিশন, যেখানে ওরিয়ন মহাকাশযানের জীবনরক্ষা ব্যবস্থা, নেভিগেশন, যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং তাপরোধী ঢাল পরীক্ষা করা হবে।

এই অভিযানে ব্যবহৃত এসএলএস রকেটের মূল কাঠামো তৈরি করেছে বোয়িং (Boeing)। কঠিন জ্বালানির বুস্টার নির্মাণ করেছে নর্থরপ গ্রুম্যান এবং ওরিয়ন মহাকাশযান তৈরি করেছে লকহিড মার্টিন (Lockheed Martin)। ফলে এই প্রকল্পে একাধিক শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অংশগ্রহণ রয়েছে।

চার নভোচারীর মধ্যে তিনজনেরই পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। রিড ওয়াইজম্যান ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ১৬৫ দিন কাটিয়েছেন। ভিক্টর গ্লোভার ২০২০ সালে স্পেসএক্সের ক্রু-১ মিশনে অংশ নিয়ে ১৬৮ দিন মহাকাশে ছিলেন। ক্রিস্টিনা কচ ২০১৯ সালে টানা ৩২৮ দিন মহাকাশে অবস্থান করে নারী নভোচারীদের মধ্যে দীর্ঘতম সময় থাকার রেকর্ড গড়েন। অন্যদিকে জেরেমি হ্যানসেনের জন্য এটি হবে প্রথম মহাকাশযাত্রা।

এই মিশনে আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক দিক রয়েছে। ভিক্টর গ্লোভার চাঁদের নিকটবর্তী অঞ্চলে যাওয়া প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী হতে যাচ্ছেন। ক্রিস্টিনা কচ হবেন প্রথম নারী নভোচারী, যিনি এ ধরনের অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। আর জেরেমি হ্যানসেন হবেন প্রথম অমার্কিন নভোচারী, যিনি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে পা রাখতে যাচ্ছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *