দেশেই উৎপাদন হয় পেট্রোল-অকটেন, তবু কেন এই তীব্র সংকটের চাপ?

তেল ফুরিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকার আসাদগেটের একটি ফিলিং স্টেশনে নিজের গাড়ি ঠেলে আনতে বাধ্য হন ফারুক মোল্লা। বুধবার সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে টানা পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর অবশেষে সাড়ে এগারোটার দিকে তিনি জ্বালানি তেল পান। দীর্ঘ ৩০ বছরের চালক জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি কখনও হননি বলে জানান।

সেই ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত গাড়িতে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা এবং মোটরসাইকেলে ৫০০ টাকার সীমা বেঁধে তেল দেওয়া হচ্ছে। ঠিক বিপরীতে থাকা আরেকটি পাম্পে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পেট্রোল ও অকটেন না থাকায় সেটি বন্ধ ছিল, যদিও ডিজেল সরবরাহ চলছিল।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ডিজেলের হলেও বর্তমান সংকটের মূল চিত্র ভিন্ন। শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় দীর্ঘ লাইনের মূল কারণ পেট্রোল ও অকটেনের ঘাটতি। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ পাম্পেই বরাদ্দ ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত, ফলে অনেক স্টেশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

উৎপাদন আছে, তবু সংকট কেন?

বাংলাদেশ প্রায় পুরো ডিজেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল হলেও পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার ব্যারেল পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদন হচ্ছে।

বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া এই কনডেনসেট দেশের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে। বছরে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ৬২ হাজার টন এবং অকটেনের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। এর বড় অংশই দেশীয় উৎপাদন ও শোধনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশীয় কনডেনসেট থেকে দুই লাখ মেট্রিক টনের বেশি পেট্রোল উৎপাদিত হয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেক। অকটেন উৎপাদন হয়েছে মোট চাহিদার প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

পেট্রোবাংলা (Petrobangla)-এর অধীন সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (Sylhet Gas Fields Limited)-এর দুটি প্ল্যান্ট ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন করেছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৬২ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৫৫ হাজার ৩৩৯ মেট্রিক টন অকটেন।

হবিগঞ্জের প্ল্যান্টে বর্তমানে প্রতিদিন সাড়ে চার হাজার ব্যারেল কনডেনসেট থেকে প্রায় ৪২০ মেট্রিক টন পেট্রোল, ৭৪ মেট্রিক টন অকটেন, পাশাপাশি কেরোসিন, ডিজেল ও অল্প পরিমাণ এলপিজি উৎপাদিত হচ্ছে।

বেসরকারি খাত ও আমদানির ভূমিকা

দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি চারটি বেসরকারি রিফাইনারিও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল ও অকটেন তৈরি করছে। এছাড়া ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (Eastern Refinery Limited) ক্রুড অয়েল শোধন করে বাজারে সরবরাহ বাড়াচ্ছে।

জ্বালানি খাতের কর্মকর্তাদের মতে, দেশীয় উৎপাদন মিলিয়ে পেট্রোলের প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে। বাকি অংশ আসে শোধিত তেল ও আমদানিকৃত কনডেনসেট থেকে।

সংকটের পেছনে আতঙ্ক ও অতিরিক্ত চাহিদা

বর্তমান পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধি। ইরান (Iran) যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা এবং তেলের সরবরাহ নিয়ে নানা খবরে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেকেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনছেন, কেউ কেউ মজুতও করছেন।

পাম্প মালিকদের মতে, আগে যেখানে প্রতিদিন ৫-৬ হাজার লিটার বিক্রি হতো, এখন সেই চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০-৩০ হাজার লিটারে। ফলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

ম তামিম (M Tamim), উপাচার্য, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (Independent University Bangladesh), বলেন—দেশীয় কনডেনসেট উৎপাদনও কমেছে। বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে।

তার মতে, পেট্রোলের চাহিদা দেশীয়ভাবে মোটামুটি মেটানো সম্ভব হলেও অকটেনের ক্ষেত্রে আমদানির প্রয়োজন হবেই। বর্তমানে বাজারে যে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে, তা মূলত ‘প্যানিক পারচেজ’-এর ফল।

সরকারের পদক্ষেপ

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (Iqbal Hasan Mahmud) জানিয়েছেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং মে মাস পর্যন্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত দামে তেল আমদানি করা হচ্ছে।

সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে—কোথাও ফুয়েল কার্ড, কোথাও জোড়-বিজোড় নম্বর অনুযায়ী তেল বিতরণ, আবার ঢাকায় মোটরসাইকেলের জন্য কিউআর কোড চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে কালোবাজারি ও অবৈধ মজুত ঠেকাতে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং পাম্পগুলোতে ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দিয়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, বর্তমানে সরকার প্রতিদিন প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন—মানুষ যদি প্রয়োজনের বাইরে তেল না কেনে, তাহলে এই সংকট দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে ডিজেল, ক্রুড অয়েল ও এলএনজি আমদানি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশের জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *