স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকার সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের পথে এগোবে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো সংবিধানের বিধান মেনে চলা, তার বাইরে কোনো বিকল্প নেই।
সংসদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “সবকিছুই—সরকার গঠন থেকে শুরু করে সংসদ ও সংসদ সদস্যদের অবস্থান—সংবিধান অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত। তাহলে সেই সংবিধানকে উপেক্ষা করে কীভাবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব?”
রোববার জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক (Zainul Abdin Faruk) কর্তৃক উত্থাপিত জন-গুরুত্বপূর্ণ মুলতবি প্রস্তাব (বিধি-৬২)-এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫: ভবিষ্যতের পথরেখা’ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যেখানে সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইন প্রণয়ন, সংশোধন, সংযোজন ও পরিমার্জনের বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা রয়েছে।
তবে তিনি ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-কে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে একে ‘লেজিসলেটিভ ফ্রড’ এবং ‘কালারেবল লেজিসলেশন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার ভাষায়, “আমরা চাই ৩৩টি রাজনৈতিক দলের অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করতে। কিন্তু এই আদেশে পূর্বে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলোর সবই অন্তর্ভুক্ত হয়নি।”
সংবিধান পুনর্লিখনের প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, জনগণের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধনের মাধ্যমেই সনদের বাস্তবায়ন সম্ভব। এ লক্ষ্যে সংসদে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি, যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নিতে পারবেন।
বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে তিনি পঞ্চম সংশোধনী পুনর্বহালের প্রসঙ্গেও প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, “পঞ্চম সংশোধনী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দ্বারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে বাতিল হয়ে যায়।”
আলোচনায় অংশ নিয়ে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (Md. Asaduzzaman) বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কোনো পথ অনুসরণের প্রয়োজন নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই সনদ নিজেই বাস্তবায়নের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয় এবং এটি কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত নয়।
তিনি আরও বলেন, “যে আইন সংবিধানের নির্ধারিত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করবে, তা কার্যকর হবে না। জুলাই সনদ জনগণের রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের ইতিহাস—এটি কোনো দলীয় দলিল নয়।”
এদিকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান (Shafiqul Rahman) মুলতবি প্রস্তাবটি গ্রহণ না করার আহ্বান জানান। তার যুক্তি, একই ধরনের প্রস্তাব আগেও সংসদে উত্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু তার ফলাফল সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি।
এ আলোচনায় আরও অংশ নেন সংসদ সদস্য গাজী এনামুল হক (Gazi Enamul Haque), আখতার হোসেন, নাজিবুর রহমান, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং আন্দালীব রহমান।
উল্লেখ্য, গত ১ এপ্রিল জয়নুল আবদিন ফারুক প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (Hafiz Uddin Ahmed) বীর বিক্রম তা আলোচনার জন্য গ্রহণ করেন। পরে ৫ এপ্রিল এ বিষয়ে দুই ঘণ্টা সময় নির্ধারণ করা হয়।
প্রস্তাব উত্থাপনকালে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, “এই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ১৭ বছরের সংগ্রাম ও ত্যাগের ফসল—বিএনপির জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের অর্জন। এটি আমাদের ভবিষ্যতের রোডম্যাপ।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, সনদটি একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যেখানে আইন ও সংবিধান সংশোধনের বিস্তারিত প্রস্তাবনা রয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত আলোচনা।


