দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে আরও টেকসই ও দায়িত্বশীল পথে এগিয়ে নিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল কম্প্যাক্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (United Nations Global Compact Network Bangladesh)। সংস্থাটির এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে ‘এসএমই টুলকিট’, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তবভিত্তিক সহায়তা প্রদান করবে।
মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সকাল ১০টায় রাজধানীর বাংলামটরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে টুলকিটটির উদ্বোধন করা হয়। এতে সহযোগিতা করেছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (Mutual Trust Bank) এবং সিএমএসএমই খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
আয়োজকদের মতে, এই টুলকিটের মাধ্যমে দেশের এসএমই উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব, সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ এবং সুশাসনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পাবেন। ফলে তারা শুধু ব্যবসায়িক উন্নয়নই নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল শিল্প সংস্কৃতি গড়ে তুলতেও সক্ষম হবেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি উল্লেখ করেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশের উন্নয়নের সূচনা হয়েছে এই খাতকে কেন্দ্র করেই।
তিনি আরও বলেন, দেশের বর্তমান পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালায় এসএমই খাতকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সবুজ ও হলুদ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে, কারণ এই খাত থেকে দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম। তবে শুরু থেকেই পরিকল্পনায় পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি বলে তিনি জোর দেন।
উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় কম জ্বালানি ব্যবহার, পানি সাশ্রয় এবং বর্জ্য উৎপাদন কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও হতে হবে পরিবেশসম্মত। টেকসই উন্নয়নের মূল দর্শন হিসেবে তিনি পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন, যেখানে উৎপাদন ও উন্নয়ন এমনভাবে পরিচালিত হবে যাতে পরিবেশের ক্ষতি না হয়।
ড. ফাহমিদা খানম আরও বলেন, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বজায় রাখা—এসব বিষয়ও টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। তিনি জানান, নতুন চালু হওয়া টুলকিটে প্রায় ৩২টি প্রশিক্ষণধর্মী উপকরণ ও আটটি মডিউল সংযুক্ত করা হয়েছে, যা উদ্যোক্তাদের বাস্তব প্রয়োগে সহায়তা করবে।
সরকারের একার পক্ষে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিল্প প্রতিষ্ঠান, উদ্যোক্তা, স্থানীয় কমিউনিটি এবং সাধারণ জনগণ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এই যৌথ প্রচেষ্টা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা কঠিন।
উদ্বোধনী বক্তব্যে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই খাতকে আরও শক্তিশালী করতে টেকসই নীতিমালা অনুসরণ করা অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে জিসিএনবির নির্বাহী পরিচালক শাহামিন এস জামান বলেন, এই টুলকিটটি একটি স্ব-মূল্যায়নভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম, যার মাধ্যমে উদ্যোক্তারা সহজেই তাদের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করতে পারবেন। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তারা অনলাইনভিত্তিক এই টুল ব্যবহার করে বুঝতে পারবেন তারা ব্যবসার কোন পর্যায়ে আছেন এবং উন্নতির জন্য কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, টেকসই ব্যবসার তিনটি মূল ভিত্তি হলো পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সুশাসন। উদ্যোক্তাদের শুধু মুনাফা নয়, বরং কর্মীদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়েও সচেতন হতে হবে।
শাহামিন এস জামান উল্লেখ করেন, বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত পরিবেশ ও সামাজিক মানদণ্ড সম্পর্কে সচেতন হলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। নতুন এই টুলকিট সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্যসহ বিভিন্ন পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা ইতোমধ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এসব বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে তা অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব, যা দেশের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। তাই সরকার ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করে পরিবেশ দূষণ কমানো এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
শেষে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই টুলকিটের মাধ্যমে দেশের উদ্যোক্তারা আরও সচেতন হবেন এবং পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবেন।


