মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার আবারও উন্মুক্ত করার পথে অগ্রগতি স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে শ্রমিক নিয়োগের ব্যয় কমাতে এবং পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে দুই দেশের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া (Malaysia) সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক বৈঠকে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এই বৈঠকে মূলত শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। মালয়েশিয়ার খাতভিত্তিক চাহিদার আলোকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশের সুযোগ দ্রুততর করার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে। পাশাপাশি, একটি ন্যায্য, নৈতিক এবং স্বচ্ছ নিয়োগ কাঠামো নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
শ্রমবাজার বিষয়ক এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নিতে আগের দিন মালয়েশিয়ায় যান আরিফুল হক চৌধুরী (Ariful Haque Chowdhury), যিনি শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। তার সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন (Mahdi Amin), যিনি একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রমবাজার নিয়ে এটিই ছিল তাদের প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, যা বিষয়টির গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম (Anwar Ibrahim)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। এ সময় বাংলাদেশের মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের উপস্থিতিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান (Tarique Rahman)-কে অভিনন্দন জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণও জানান।
যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দুই দেশ শ্রমিক শোষণ রোধে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ এবং পরিচ্ছন্ন নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, শিক্ষক বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এবং শিক্ষা খাতে যৌথ কাজের সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠে আসে। উভয় পক্ষই সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত সহযোগিতার অঙ্গীকার করে।
পরে শ্রম অভিবাসন নিয়ে দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রমনন রামকৃষ্ণনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরিফুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এই বৈঠকে শ্রম অভিবাসনে দীর্ঘমেয়াদি ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে ওঠে।
দ্বিপাক্ষিক বিবৃতিতে বলা হয়, একটি স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তবসম্মত কাঠামোর মাধ্যমে শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া হবে। এতে বিদ্যমান নিয়োগসংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা দূর করা, নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং বাজারের চাহিদার সঙ্গে শ্রম সরবরাহের সামঞ্জস্য বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশেষভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, মালয়েশিয়ার খাতভিত্তিক চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া দ্রুত করা হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব কমিয়ে আনা, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস, বিশ্বস্ত ও যোগ্য নিয়োগকারী সংস্থা ব্যবহারের মাধ্যমে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। আটকে পড়া শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে প্রযুক্তিনির্ভর, এআই-চালিত নিয়োগ ব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়, যা মধ্যস্থতাকারীর সংখ্যা কমিয়ে এনে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও সরাসরি ও ব্যয়-সাশ্রয়ী করবে। এতে নিয়োগকারীর মাধ্যমে সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের বিষয়টিও নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ এই ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।
এছাড়া মানব পাচার সংক্রান্ত চলমান আইনি বিষয়, নিয়োগে অনিয়ম এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ব্যবস্থার সমন্বয় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকের শেষে উভয় দেশ নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের উষ্ণতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


