উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে নতুন দিগন্ত—মালয়েশিয়া-বাংলাদেশের সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার

উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ (Bangladesh) ও মালয়েশিয়া (Malaysia)। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) পুত্রাজায়ায় মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই ঐকমত্যে পৌঁছান দেশটির উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জাম্ব্রি আবদুল কাদির (Zambry Abdul Kadir) এবং প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন (Mahdi Amin)।

দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠকে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মশক্তির গতিশীলতা—সবগুলো ক্ষেত্রেই সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে বৃত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ এবং মালয়েশিয়ার সমাজে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আরও কার্যকরভাবে একীভূত করার ওপর আলাদা করে জোর দেয় উভয় পক্ষ।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী (Ariful Haque Chowdhury)। এর আগে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম (Anwar Ibrahim)-এর কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন। সেই বৈঠকেও দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

একই দিনে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী দাতো শ্রী রমনন রামকৃষ্ণনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আরেকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের বাস্তবসম্মত পথ খোঁজার চেষ্টা করা হয়।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বৈঠকের শুরুতেই উভয় পক্ষ শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ম্যান্ডেটকে স্বীকৃতি দিয়ে নতুন নীতিমালার আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার ইচ্ছা প্রকাশ করে।

উপদেষ্টা মাহদী আমিন আন্তর্জাতিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়ে বলেন, এটি বাংলাদেশের মানবসম্পদকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বহুমুখী শিক্ষাক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, একটি সুসংগঠিত বৃত্তি কাঠামো শুধু শিক্ষাগত উৎকর্ষই নয়, বরং বিদেশে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তিও নিশ্চিত করতে সহায়ক। শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তা পরিষেবা সহজলভ্য করা এবং তাদের সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মাহদী আমিন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারিত্ব জোরদার, একাডেমিক বিনিময় কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং যৌথ শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করবে।

জাম্ব্রি আবদুল কাদির এসব প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বাড়ানোর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় এবং এতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ১১ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন, যাদের অধিকাংশই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত।

উভয় পক্ষই স্বীকার করেছে, এসব শিক্ষার্থী কেবল একাডেমিক বিনিময়েই নয়, বরং আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এবং দেশে ফিরে তারা উন্নয়নে অবদান রাখছে।

বৈঠকে পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত যোগ্যতা, যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম, দূরশিক্ষণ এবং নমনীয় শিক্ষাপদ্ধতি চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী একাডেমিক প্রোগ্রাম সাজানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

স্নাতকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। মাহদী আমিন মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবমুখী পেশাগত অভিজ্ঞতার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সহায়ক হবে।

সবশেষে, কাঠামোগত বৃত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, শিক্ষার্থী সহায়তা উন্নত করা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গভীর করার প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে বৈঠক শেষ হয়—যা ভবিষ্যতে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *