বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়ার পথ আগের তুলনায় যে অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে, তা এখন আর শুধু ধারণা নয়—বাস্তবতার কঠিন প্রতিফলন। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়াকে ঘিরে সাম্প্রতিক তথ্য এই চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
✈️ ভিসা জটিলতার বেড়ে যাওয়া চাপ
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে এখন স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়া আগের মতো সহজ নেই। ভিসা রিজেকশনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে, এমনকি “genuine student” প্রমাণ করতেও আবেদনকারীদের বাড়তি প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার ডিপার্টমেন্ট অব হোম অ্যাফেয়ার্স (Department of Home Affairs)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদনের মাত্র ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ অনুমোদিত হয়েছে—যা গত ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন। ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ থেকে আবেদনকারীদের ৫১ শতাংশই ভিসা পাননি—অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বাস্তবতা
বিদেশে পড়াশোনার খরচও এখন বড় একটি বাধা। টিউশন ফি, আবাসন এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় সবই বেড়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় এই চাপ আরও তীব্র হয়েছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর জন্য বিদেশে পড়াশোনা এখন আর্থিকভাবে আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে স্কলারশিপ পাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক।
কঠোর নীতিমালা ও সীমাবদ্ধতা
অনেক দেশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নিয়ম চালু করেছে। পার্ট-টাইম কাজের সুযোগ সীমিত করা, পড়াশোনা শেষে থাকার অনুমতি কমিয়ে দেওয়া এবং নির্দিষ্ট কোর্স বা প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ—এসবই শিক্ষার্থীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়তি শর্ত
শুধু ভিসা নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব শর্তও এখন কঠোর হয়েছে। IELTS বা TOEFL স্কোর বেশি চাওয়া হচ্ছে, একাডেমিক ফলাফলেও উচ্চ মান বজায় রাখতে হচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারভিউ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের প্রভাব
রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক দেশ অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা এনেছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উপর নজরদারিও বেড়েছে।
টাইমস হায়ার এডুকেশন](https://tazakhobor.com/tag/টাইমস-হায়ার-এডুকেশন) (Times Higher Education) এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার উল্লেখযোগ্য। ভারতে ৪০ শতাংশ, নেপালে ৬৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩৮ শতাংশ এবং ভুটানে ৩৬ শতাংশ আবেদন বাতিল হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ট্রেলিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাইয়ে আরও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আবেদনকারী সত্যিই পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে কি না—এই বিষয়টিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এদিকে আবেদন সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আবেদন বেড়েছে ৫১ শতাংশ, ভারতে ৩৬ শতাংশ এবং নেপালে ৯১ শতাংশ। তবে চীন থেকে আবেদন কমেছে।
এই প্রবণতা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও প্রভাবিত করছে। ভিসা না পাওয়ার হার বাড়লে কোনো প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি সূচক বাড়ে, ফলে ভবিষ্যতে ওই প্রতিষ্ঠানের আবেদন আরও কঠোরভাবে যাচাই হতে পারে।
এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া (International Education Association of Australia)। সংগঠনটি বলছে, ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার যেভাবে বাড়ছে, তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সময়টা এখন বেশ কঠিন। তাই আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, আর্থিক প্রস্তুতি এবং যোগ্যতা যাচাই আরও সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।


