পহেলা বৈশাখের প্রাক্কালে উৎসবের ঢেউ: নতুন বছরের আহ্বানে জেগে উঠছে বাঙালির প্রাণ

নতুন বছরের আগমনীসুর যেন ইতোমধ্যেই ভেসে উঠেছে চারপাশের বাতাসে। পুরনো বছরের জীর্ণতা, গ্লানি ও শোককে বিদায় জানিয়ে আগামীকাল শুরু হচ্ছে নতুন প্রাণের উৎসব—পহেলা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ঋতুচক্রের স্বাভাবিক নবায়নের মতোই এই দিনটি বয়ে আনে নতুন আশার আলো, পুনর্জাগরণের বার্তা এবং ঐক্যের অটুট বন্ধন।

হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এ দিনটি আজ জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে এক সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাদেশি একযোগে মেতে উঠবে বাংলা বর্ষবরণের আনন্দে। অন্তরের গভীরে লালিত দেশপ্রেম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই দিনে। প্রত্যাশা একটাই—অশুভ ও অসুন্দর দূরীভূত হোক, সত্য ও সুন্দরের জয়গান প্রতিধ্বনিত হোক সর্বত্র, বিদায়ী বছরের সব দুঃখ-বেদনা মুছে যাক।

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (Mohammad Shahabuddin) এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) পৃথক বার্তায় দেশবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বার্তায় ঐক্য, সম্প্রীতি ও নতুন প্রত্যয়ের আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের সর্বজনীন উৎসব—যা অসাম্প্রদায়িক চেতনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ অতিক্রম করে এ দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দ ও মিলনের প্রতীক। আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে এর গুরুত্ব অপরিসীম বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বৈশাখের আগমনে জীবনে জাগে নতুন প্রত্যাশা, নতুন প্রতিশ্রুতি এবং অসীম সম্ভাবনার স্বপ্ন—অতীতের গ্লানি পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দিনটি নতুনের আহ্বান নিয়ে ফিরে আসে, পুরোনো গ্লানি ঝেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই উৎসবের সঙ্গে কৃষি, প্রকৃতি এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রযুক্তির এই যুগেও কৃষক প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফসল উৎপাদনের সময় নির্ধারণ করে। হাজার বছরের লোকজ সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মূল্যবোধ পহেলা বৈশাখের মধ্য দিয়ে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।

শহরের পাশাপাশি গ্রামবাংলাও প্রস্তুত বর্ষবরণের উচ্ছ্বাসে। নানা বয়সী নারী, পুরুষ ও শিশুরা বর্ণিল পোশাকে উদযাপন করবে দিনটি। বসবে বৈশাখী মেলা, আয়োজন থাকবে বলিখেলা, লাঠিখেলা এবং হা-ডু-ড’ুর মতো ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার। চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলিখেলা—যা শতবর্ষের ঐতিহ্য বহন করে আসছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এ বরাবরের মতোই আয়োজন করা হয়েছে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার। লোকঐতিহ্য ও স্বকীয়তার বহিঃপ্রকাশে বৃহৎ পরিসরে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়েছে। শোভাযাত্রার থিম ও মোটিফে ফুটে উঠবে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি। বাঁশ, কাঠ ও রঙিন কাগজে তৈরি বিশাল বাঘ, হাতি, ময়ূর এবং মা-শিশুর প্রতিকৃতি শোভাযাত্রায় যোগ করবে ভিন্নমাত্রা। এর মূল বার্তা—অশুভ শক্তির বিনাশ এবং কল্যাণময় আগামীর পথে যাত্রা।

এবারের শোভাযাত্রায় ‘মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া’—এই পাঁচটি মোটিফ বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। লোকজ প্রতীকের ধারায় এগুলো যথাক্রমে শক্তি, সৃজন, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার প্রতীক হিসেবে বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। পাশাপাশি ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’ এবং দেশাত্মবোধক গান শোভাযাত্রার আবহকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। এতে অংশ নেবে ২০০ জন শিক্ষার্থী, যারা বহন করবে জাতীয় পতাকা।

‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’—এই প্রতিপাদ্য নিয়ে ছায়ানট (Chhayanaut)-এর শিল্পীরা রমনার বটমূলে সম্মিলিত কণ্ঠে পরিবেশন করবেন বর্ষবরণের গান, যা দীর্ঘদিন ধরেই এ দিনের অন্যতম আকর্ষণ। অন্যদিকে উদীচী (Udichi)-র আয়োজনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে গান, কবিতা, নৃত্য ও আড্ডা; বিকেলে অনুষ্ঠিত হবে মূল পর্ব, যার প্রতিপাদ্য—‘বৈশাখের রুদ্র-রোষে ধ্বংস হোক সামাজিক ফ্যাসিবাদ।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (Dhaka South City Corporation) বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। ‘বাংলার হারিয়ে যাওয়া আনন্দ মিলে যাক বৈশাখে’—এই প্রতিপাদ্যে ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত পুতুলনাট্য উপস্থাপন করা হবে।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সারাদেশে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করবে। জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিও আয়োজন করেছে পৃথক অনুষ্ঠানমালা।

নববর্ষের এই প্রভাতে, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আবারও উচ্চারিত হবে বাঙালির চিরন্তন আহ্বান—নতুনের জয়, মানবতার জয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *