১১ জুন পর্যন্ত সাগরে সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, প্রজনন রক্ষায় ৫৮ দিনের কড়াকড়ি

বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছের অবাধ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার আবারও কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ৫৮ দিনের জন্য মৎস্য আহরণে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, যা কার্যকর হচ্ছে বুধবার (১৫ এপ্রিল) মধ্যরাত থেকে এবং চলবে আগামী ১১ জুন পর্যন্ত।

রাতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় (Ministry of Fisheries and Livestock) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানায়। সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, এই সময়ের মধ্যে সাগরে সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকবে।

পেছনের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে। মেরিন ফিশারিজ অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৫ দিনের জন্য বঙ্গোপসাগর (Bay of Bengal)-এ মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছিল সরকার। শুরুতে এই নিয়ম শুধু ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলারের জন্য প্রযোজ্য থাকলেও, ২০১৯ সাল থেকে উপকূলীয় সব ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও নৌকাকেও এর আওতায় আনা হয়।

তবে এই দীর্ঘ ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দেশীয় জেলেদের মধ্যে অসন্তোষ কম ছিল না। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশের জলসীমায় মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও পার্শ্ববর্তী দেশের জেলেরা সুযোগ নিয়ে ঢুকে পড়ে এবং অবাধে মাছ শিকার করে। এতে দেশীয় জেলেরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিলেন।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এবং জেলেদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার অবরোধের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ করে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত (India)-এর নিষেধাজ্ঞার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৬৫ দিনের পরিবর্তে ৫৮ দিন নির্ধারণ করা হয়। গত বছর ১১ মার্চ জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত নতুন এই সময়সীমা কার্যকর করা হয়, যা চলতি বছরেও বহাল রাখা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের জীবিকা যাতে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে দিকেও নজর দিয়েছে সরকার। উপকূলীয় ১৪টি জেলার ৬৭টি উপজেলা এবং চট্টগ্রাম মহানগরসহ মোট ৩ লাখ ১১ হাজার ৬২ জন সমুদ্রগামী জেলেকে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। প্রত্যেককে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে চাল প্রদান করা হবে ৫৮ দিনের জন্য।

আইন বাস্তবায়নেও কড়াকড়ির ইঙ্গিত দিয়েছে সরকার। ২০২৫ সালে একই মেয়াদের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যাপক অভিযান চালায়। সে সময় ৩ হাজার ৫৮৫টি অভিযান এবং ১৩৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।

অভিযানে ৫ হাজার ২১৯টি জাল জব্দ করা হয় এবং ৮১.৬২ মেট্রিক টন মাছ আটক করা হয়। পাশাপাশি ৪৫টি নৌযান জব্দ করা হয়। আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৫৫টি মামলা দায়ের, ১৬ জনকে কারাদণ্ড এবং মোট ৩৪.৮২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

সব মিলিয়ে, সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা ও ভবিষ্যৎ মৎস্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে সরকারের এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও জেলেদের জীবিকা ও বাস্তবতার প্রশ্নটি এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *