‘জুলাই সনদ’ ঘিরে সংসদে উত্তেজনা, তর্ক-বিতর্কে অচলাবস্থা

জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনাকে কেন্দ্র করে ‘জুলাই সনদ’ এবং গণঅভ্যুত্থানের একক কৃতিত্ব দাবি নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়েছে। আলোচনার এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে অধিবেশন কক্ষ জুড়ে শুরু হয় সমস্বরে প্রতিবাদ, পাল্টা বক্তব্য এবং তীব্র বাদানুবাদ।

সোমবার (২৭ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (Hafiz Uddin Ahmed) বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে এই পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম রনি (Manjurul Karim Rony) ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে চলমান বিতর্কের কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য দিলে বিরোধী দলীয় বেঞ্চ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া আসে।

বক্তব্যে মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, সংসদের প্রথম দিন থেকেই একটি ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করা হয়েছে। বিরোধী দলের নেতাদের উদ্দেশে তিনি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন—জুলাই আন্দোলনকে যদি একক অর্জন হিসেবে দাবি করা হয়, তাহলে তা অন্যদের অবদানকে অস্বীকার করার শামিল। তিনি বলেন, “আমরাও তো সেখানে ছিলাম, আমাদেরও ৪০০-র বেশি সহযোদ্ধাকে হারাতে হয়েছে।”

এরপর তিনি আরও দাবি করেন, আওয়ামী লীগ (Awami League), জাতীয় পার্টি (Jatiya Party) ও জামায়াত (Jamaat)–এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও বিএনপি একমাত্র দল, যাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নেই। একইসঙ্গে বিরোধী দলের নেতাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষায়, “১৭ বছরের রাজপথের সংগ্রামের সামনে তিন-চার বছরের হুংকার কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।”

এই বক্তব্য শেষ হতেই বিরোধী দলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে একযোগে প্রতিবাদ শুরু করেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলাম (Md. Nurul Islam) ফ্লোর নিয়ে উচ্চস্বরে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায়ই বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ‘জুলাই সনদ’-এর আলোচনাকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, “জুলাই সনদকে খাটো করা মানে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং শহীদদের আত্মত্যাগকে অপমান করা।” তার এই বক্তব্যের সময় সংসদ কক্ষে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল হইচই শুরু হয়, যা দ্রুতই রূপ নেয় তীব্র বাকবিতণ্ডায়।

উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বারবার হস্তক্ষেপ করেন। তিনি সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো মতভিন্নতা এবং বাকস্বাধীনতা। তাই প্রত্যেক সদস্যেরই নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “অহেতুক কাউকে বাধা দেওয়া বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা উচিত নয়। কারো বক্তব্য পছন্দ না হলে পরবর্তীতে নিজ নিজ সময় নিয়ে শালীনভাবে তার জবাব দেওয়া যেতে পারে।”

স্পিকারের ধারাবাহিক হস্তক্ষেপের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে কিছুটা শান্ত হয়, যদিও দিনের আলোচনায় ‘জুলাই সনদ’ ইস্যুটি সংসদের ভেতরে গভীর বিভাজনের চিত্র স্পষ্ট করে তোলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *