প্লাস্টিকের দাপটে হারাচ্ছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্য, শীতল পরশের মাদুর এখন স্মৃতির গহ্বরে

শীতল পরশ, প্রাকৃতিক ঘ্রাণ আর পরিবেশবান্ধবতার এক অনন্য প্রতীক—গ্রামীণ জীবনের সেই চিরচেনা মাদুর আজ যেন হারিয়ে যাওয়ার পথে। একসময় ঘরের অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত এই মাদুর এখন কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কালের পরিবর্তনে সাতক্ষীরা (Satkhira) জেলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে দিন গুনছে।

জেলার আশাশুনি (Assasuni) উপজেলার বড়দল, কুল্যা ও কাদাকাটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে একসময় ব্যাপকভাবে মেলে ঘাস চাষ হতো। এই ঘাস দিয়েই তৈরি হতো নান্দনিক ও আরামদায়ক মাদুর। একসময় এই শিল্পকে কেন্দ্র করে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছিল। দক্ষিণাঞ্চলের, বিশেষ করে খুলনা (Khulna) অঞ্চলের বৃহত্তম হাট বড়দলে পাইকারিভাবে বিক্রি হতো এসব মাদুর। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে ভিড় জমাতেন, তৈরি হতো এক প্রাণবন্ত বাণিজ্য কেন্দ্র।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন। খাট, তোষক, বেডশিট এবং বিশেষ করে প্লাস্টিকের মাদুরের সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে ঐতিহ্যবাহী মাদুরের চাহিদা ক্রমেই কমে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই শিল্পের ওপর, যা ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার পথে।

তবুও আশার আলো একেবারে নিভে যায়নি। তালা (Tala) ও আশাশুনি উপজেলার কিছু পরিবার এখনও পিতৃপুরুষের এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে আছেন। তাঁদের ভাষ্যমতে, মেলে ঘাস কিনতে হয় বাকিতে, আর মাদুর বিক্রি করে সেই দেনা শোধ করতে হয়। লাভের পরিমাণ খুবই সামান্য হলেও বিকল্প পেশার অভাবে তারা এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

এই শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীদের অবদান। পরিবারের নারীরাই অধিকাংশ সময় মাদুর বোনার কাজে যুক্ত থাকেন, যা এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।

এদিকে, এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (BSCIC)। আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তার মাধ্যমে মাদুর শিল্পকে আবারও সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে নতুন প্রজন্মের কাছে এই পণ্যকে পৌঁছে দেওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সম্ভাবনাময় এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। ঐতিহ্যের এই নিদর্শনকে বাঁচিয়ে রাখতে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *