বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর ঘোষণা, শ্রমিকদের ঘিরে নতুন প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের সমাবেশে বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) বিভিন্ন সময়ের শহীদ শ্রমিকদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ শ্রমিক, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আত্মাহুতি দেওয়া শ্রমজীবী মানুষ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া শ্রমিক দলের ৭২ জন শহীদ—সবার প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা চিরস্থায়ী।

তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষ স্বৈরাচারকে বিদায় দিয়েছে। সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, খেটে খাওয়া মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, অর্থনীতি লুটপাটের মাধ্যমে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল এবং একের পর এক শিল্প-কলকারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে বা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। তবে এখন সময় এসেছে শ্রমিক, শিক্ষক, ছাত্র, নারী-পুরুষ সবাই মিলে দেশ পুনর্গঠনের।

নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য ৩১ দফা কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল। তিনি জনতার উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, সেই পরিকল্পনায় কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও নারীদের জন্য যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। তার ভাষায়, শ্রমিক ও কৃষক বাঁচলে দেশ ভালো থাকবে—এই দর্শন থেকেই সরকার এগোচ্ছে।

তিনি জানান, সরকার গঠনের পরপরই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ শুরু হয়েছে। নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে সব পরিবারের কাছে পৌঁছাবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে এবং কৃষক কার্ড বিতরণের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের তরুণদের মধ্য থেকে পেশাদার খেলোয়াড় তৈরি করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরও জোরদার হয়। তিনি জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)-এর ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতার উদাহরণ টেনে বলেন, সেই ধারাবাহিকতায় নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে ভবিষ্যতের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করা হবে।

গণতন্ত্রের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের মানুষ আবার হারিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যখনই বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে এগিয়েছে, তখনই শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে। তিনি খালেদা জিয়া (Khaleda Zia)-এর নেতৃত্বে দেশের ‘এমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন।

তবে গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রা কিছু মহলের পছন্দ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করছে, যদিও বিশ্ব ইতোমধ্যেই বর্তমান সরকারের পেছনে জনগণের সমর্থন দেখতে পাচ্ছে।

দেশ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “করবো কাজ, গড়বো দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ” স্লোগান শুধু নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা। শ্রমিক দিবসে তিনি সবাইকে দেশগড়ার শ্রমিক হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করার আহ্বান জানান।

সমাবেশে তিনি উপস্থিত জনতার কাছে প্রতিজ্ঞা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের জন্য কাজ করতে সবাই প্রস্তুত কি না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন জিয়াউর রহমানের সেই বিখ্যাত উক্তি—“প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ।”

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর নয়াপল্টনে এটি ছিল তার প্রথম জনসমাবেশে অংশগ্রহণ। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir), ড. আব্দুল মঈন খান (Abdul Moyeen Khan), নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

এদিন সকাল থেকেই বিরূপ আবহাওয়া উপেক্ষা করে মানুষের ঢল নামে সমাবেশস্থলে। লাল টুপি ও টি-শার্ট পরে, হাতে ব্যানার নিয়ে খণ্ড খণ্ড মিছিলসহ নেতা-কর্মীরা নয়াপল্টনে জড়ো হন। স্লোগান ও করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *