দেশের সর্ববৃহৎ আইনজীবী সংগঠন ঢাকা আইনজীবী সমিতি (Dhaka Bar Association)-এর ২০২৬-২৭ কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচনে একতরফা আধিপত্য দেখিয়েছে বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেল। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ মোট ২৩টি পদেই নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে এই প্যানেল, যা রাজনৈতিক অঙ্গনেও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
শুক্রবার (১ মে) রাত প্রায় ১২টার দিকে নির্বাচন কমিশন ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জোট করে গণঅধিকার পরিষদ নীল প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। বিপরীতে, জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami)-এর সঙ্গে জোট বেঁধে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সবুজ প্যানেল গঠন করে মাঠে নামে।
সভাপতি পদে বিএনপি জোটের প্রার্থী আনোয়ার জাহিদ ভূইয়া ৪৪৬৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত জোটের এস এম কামাল উদ্দিন পান ২১৭৯ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ইউনুস আলী বিশ্বাস পান ১৪৬ ভোট।
সাধারণ সম্পাদক পদেও স্পষ্ট ব্যবধানে জয় পেয়েছেন বিএনপি জোটের আবুল কালাম খান, তিনি পেয়েছেন ৪০৪৫ ভোট। একই পদে জামায়াত জোটের আবু বক্কর সিদ্দিক ১৬৬১ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে মো. শহিদুল্লাহ পান ৪২৪ এবং বলাই চন্দ্র দেব পান ৩৫৫ ভোট।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও বিএনপি জোটের প্রার্থীরা একচেটিয়া জয় পেয়েছেন। সিনিয়র সহসভাপতি পদে রেজাউল করিম চৌধুরী পেয়েছেন ৪৫০৮ ভোট, সহসভাপতি পদে আবুল কালাম আজাদ ৪৪৩৩ ভোট, ট্রেজারার পদে আনিসুজ্জামান আনিস ৩৯৪৭ ভোট অর্জন করেন। সিনিয়র সহসাধারণ সম্পাদক পদে ইলতুমিশ সওদাগার আ্যনি ৪৩৫৫, সহসাধারণ সম্পাদক পদে মেহেদী হাসান জুয়েল ৩৬৯৯ ভোট পান।
লাইব্রেরি সেক্রেটারি খন্দকার মাকসুদুল হাসান ৪৩২০ ভোট, কালচারাল সেক্রেটারি মারজিয়া হিরা ৩৮৭৯ ভোট, অফিস সেক্রেটারি আফজাল হোসেন মৃধা ৩৯৪০ ভোট, স্পোর্টস সেক্রেটারি সোহেল খান ৪০৯৪ ভোট এবং সোস্যাল ওয়েলফেয়ার সেক্রেটারি এ এইচ এম ফিরোজ ৪১৪৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পাদক পদে শফিকুল ইসলাম শফিক সর্বোচ্চ ৪৫৯৭ ভোট পান।
কার্যকরী সদস্য পদেও বিএনপি জোটের প্রার্থীদের প্রাধান্য দেখা গেছে। সর্বোচ্চ ৪৪২৩ ভোট পেয়ে ফারজানা ইয়াসমিন প্রথম হন। নজরুল ইসলাম মামুন ৪৩০৩ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় এবং আদনান রহমান ৪২৭৫ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। এছাড়া সৈয়দ সারোয়ার আলম নিশান, মামুন মিয়া, নিজামউদ্দিন, সামিউল, মোজাহিদুল ইসলাম সায়েম, এ এইচ এম রেজাউনুল সৈয়দ রোমিও এবং শেখ শওকত হোসেন নির্বাচিত হন।
অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীরা সব গুরুত্বপূর্ণ পদেই পরাজিত হয়েছেন। সিনিয়র সহসভাপতি থেকে শুরু করে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সম্পাদক এবং সদস্য পদ পর্যন্ত কোনো অবস্থানেই তারা জয়লাভ করতে পারেননি।
তবে ফল ঘোষণার পরপরই নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party – NCP) সমর্থিত ন্যাশনাল লইয়ার্স অ্যালায়েন্স এক বিজ্ঞপ্তিতে ভোট ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’, জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগ তোলে।
এ বিষয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মো. বোরহান উদ্দিন অভিযোগগুলোকে সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে কোনো অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি নেই। তার ভাষায়, কেউ যখন পরাজয় বুঝতে পারে, তখনই নানা অজুহাত তোলে—এটিও তেমনই একটি প্রচেষ্টা।
উল্লেখ্য, গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল দুই দিনব্যাপী ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। মোট ২০ হাজার ৭৮৫ জন ভোটারের মধ্যে ৭ হাজার ৬৯ জন আইনজীবী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা মোট ভোটারের ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোটার ভোট দেননি।
এই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (Bangladesh Awami League) সমর্থিত সাদা প্যানেল অংশ নেয়নি। যদিও দলটির কিছু সমর্থক আইনজীবী স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হতে চাইলেও মনোনয়ন পেতে বাধার সম্মুখীন হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ২১টি পদে জয়লাভ করেছিলেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। নির্বাচিত আইনজীবীরা আদালতে অনুপস্থিত থাকায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ১৩ আগস্ট বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা একটি অ্যাডহক কমিটি গঠন করে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।


