দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনধারীর সংখ্যা ইতোমধ্যেই ১ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। তবে এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে চলতি বছরে রিটার্ন জমা দিয়েছেন প্রায় সাড়ে ৪২ লাখ করদাতা। বাস্তবতা হলো—টিআইএন বা টিন সার্টিফিকেট এখন আর কেবল কর দেওয়ার বিষয় নয়; এটি দৈনন্দিন বহু গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকেই শুধু প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার জন্যই বাধ্য হয়ে টিআইএন নিচ্ছেন, যদিও পরবর্তীতে অনেকেই নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (National Board of Revenue – NBR)-এর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সহজেই টিআইএন নিবন্ধন করা সম্ভব। তবে এই নিবন্ধন না থাকলে কী ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হতে পারে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে টিআইএন এখন প্রায় বাধ্যতামূলক। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে মূল বেতন ১৬ হাজার টাকার বেশি হলে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক বা তদারকি পর্যায়ের কর্মীদের জন্য টিআইএন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সিটি করপোরেশন বা পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া কিংবা নবায়নের জন্য টিআইএন প্রয়োজন। একইভাবে জমি বা ফ্ল্যাটের মালিকানা নিবন্ধন করতে গেলেও টিআইএন ছাড়া কাজ এগোবে না। অর্থাৎ সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
গাড়ির মালিকদের জন্যও টিআইএন বাধ্যতামূলক। গাড়ি নিবন্ধন থেকে শুরু করে ফিটনেস নবায়ন—সব ক্ষেত্রেই এই নম্বর প্রয়োজন।
পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও ছাড় নেই। চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী কিংবা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট—যে কোনো নিবন্ধিত পেশায় সনদ পেতে হলে টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্তদের জন্যও এটি অপরিহার্য। যারা ঋণপত্র (এলসি) খোলেন বা ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন, তাদের টিআইএন ছাড়া কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়।
সরকারি বা স্থানীয় সরকারের দরপত্রে অংশ নিতে গেলেও টিআইএন প্রয়োজন। একইভাবে ব্যাংক থেকে ক্রেডিট কার্ড পেতে হলেও এই নম্বর থাকতে হবে।
সমাজের উচ্চবিত্ত পরিমণ্ডলেও টিআইএন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঢাকা, গুলশান বা উত্তরা ক্লাবের মতো অভিজাত ক্লাবের সদস্য হতে চাইলে টিআইএন দরকার হয়। এমনকি সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকের টিআইএন চাওয়া হয়।
ছোট-বড় ব্যবসার ক্ষেত্রেও এটি অপরিহার্য শর্ত। মোবাইল রিচার্জ, মোবাইল ব্যাংকিং, পরিবেশক এজেন্সি, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ক্যাটারিং, জনবল সরবরাহ কিংবা সিকিউরিটি সার্ভিস—সব ক্ষেত্রেই টিআইএন প্রয়োজন।
এছাড়া আরও বহু সেবার সঙ্গে এটি যুক্ত। যেমন—ঋণপত্র স্থাপন, রপ্তানি নিবন্ধন সনদ গ্রহণ, বীমা জরিপ কার্যক্রম, পেশাজীবী সংগঠনের সদস্যপদ, কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হওয়া, বিবাহ নিবন্ধন বা কাজির দায়িত্ব পালন, এমনকি ড্রাগ লাইসেন্স গ্রহণের ক্ষেত্রেও টিআইএন প্রয়োজন।
ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি ঋণ নিতে গেলেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রাজনীতিতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। জাতীয় সংসদ, সিটি করপোরেশন, উপজেলা বা পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাইলে টিআইএন থাকা আবশ্যক।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রায় ৪০ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও কার্যক্রম এখন টিআইএন ছাড়া কার্যত অচল। ফলে এটি শুধু করদাতার পরিচয়পত্র নয়—বরং নাগরিক জীবনের একটি অপরিহার্য নথিতে পরিণত হয়েছে।


