রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (Bangladesh Television)-এর বার্ষিক বাজেট ৩০০ কোটিরও বেশি, অথচ আয় বছরে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকা—এই বৈপরীত্য তুলে ধরে কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
তিনি জানান, বিটিভির বাজেট ৩২০ থেকে ৩২৫ কোটি টাকার মধ্যে ঘোরাফেরা করলেও আয় অত্যন্ত সীমিত। “পুরোটাই একটি ভর্তুকিনির্ভর প্রতিষ্ঠান। প্রশ্ন হচ্ছে—এটি আসলে কী দিচ্ছে? জনগণের অর্থ দিয়ে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের আউটপুট কী?”—এভাবে সরাসরি জবাবদিহিতার প্রসঙ্গ তুলেন তিনি।
রবিবার (৩ মে) রাজধানীর ধানমন্ডিতে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনায় এসব মন্তব্য করেন তিনি। সভার আয়োজন করে ইউনেসকো (UNESCO) এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh)।
বিটিভির বর্তমান কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে উপদেষ্টা বলেন, “খবরের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বিটিভির তেমন কোনো প্রাসঙ্গিকতা আমি দেখি না। যখন বেসরকারি গণমাধ্যমগুলো রয়েছে, তখন তারা বরং আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারে।”
বিটিভি বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে বন্ধ করাও অসম্ভব নয়। যদিও এটি একটি তাত্ত্বিক মন্তব্য বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য হবে প্রতিষ্ঠানটিকে এমনভাবে ব্যবহার করা, যাতে তা জনগণের উপকারে আসে। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় টেলিভিশন হিসেবে বিটিভির সম্ভাবনা এখনও রয়েছে, যেমনটি বেতারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
অতীতের নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্যাবল টিভিতে বাধ্যতামূলকভাবে বিটিভির সংবাদ দেখানোর নিয়ম ছিল। তবে জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলে তার ইতিবাচক ফল আসে না বলেই মত দেন তিনি। “মানুষ কি সত্যিই সেই খবর দেখত? গায়ের জোরে ভালো কিছু হয় না,”—বলেছেন তিনি। জনগণের অর্থ অপচয়ের বিরোধিতাও পুনর্ব্যক্ত করেন এই উপদেষ্টা।
তিনি আরও জানান, বিটিভি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে এবং সেখানেও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি উঠে এসেছে।
এদিকে অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবিও ওঠে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (Newspaper Owners Association of Bangladesh)-এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে এবং তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
নারীর প্রতি সাইবার সহিংসতা প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে এই সেল কাজ করবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে জাহেদ উর রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, “সরকারের যৌক্তিক সমালোচনা আরও জোরালোভাবে করা উচিত। আমি চাই, দেশে একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী গণমাধ্যম গড়ে উঠুক।”
তার মতে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের জন্য গণমাধ্যমের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। বর্তমান সরকার এমন কিছু করতে চায় না, যা গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করে।
সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা নিয়ে কারচুপির অভিযোগের দিকেও দৃষ্টি দিয়েছে সরকার। কীভাবে নির্ভুল সার্কুলেশন তথ্য পাওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মূলধারার গণমাধ্যমের নামে ছড়ানো ভুয়া খবর ও ফটোকার্ডের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
সবশেষে, ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স’-এ বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, এটি বর্তমান সরকারের দায় নয়; বরং পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার ফলাফল।


