যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে টানা ৮০ দিন বন্ধ থাকার পর চলতি সপ্তাহে পুনরায় চালু হচ্ছে ইরান (Iran)-এর শেয়ারবাজার। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক সংকটে চাপে থাকা দেশটির অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা যাচাইয়ের বড় সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে এই বাজার পুনরায় চালুর ঘটনাকে।
ইরানের শেয়ার, ইক্যুইটি ফান্ড এবং ইক্যুইটি-ভিত্তিক ডেরিভেটিভস লেনদেন মঙ্গলবার ও বুধবার থেকে আবার শুরু হবে। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করতে পারে এবং বন্ধকালীন সময়ে যেসব কোম্পানি শেয়ারহোল্ডার সভা করেছে, সেগুলোর তথ্য বিনিয়োগকারীদের সামনে আনতে পারে—সে জন্য বাজার পরিচালনার সময়ও এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক সূচক থেকে বিচ্ছিন্ন ইরানের শেয়ারবাজার গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হয়ে যায়। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরান (Tehran)সহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হা’\মলা চালায়। এরপর থেকেই বাজারে লেনদেন স্থগিত ছিল।
ইরানের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্গানাইজেশনের উপপ্রধান হামিদ ইয়ারি (Hamid Yari) রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, বিনিয়োগকারীদের সম্পদ রক্ষা, আবেগতাড়িত বিক্রি ঠেকানো এবং স্বচ্ছ তথ্যের ভিত্তিতে বাজার চালুর পরিবেশ তৈরির জন্যই বাজার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, শুরুতে আতঙ্কজনিত ব্যাপক শেয়ার বিক্রি ঠেকানো গেলেও দীর্ঘ সময় লেনদেন বন্ধ থাকায় বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। একই সঙ্গে পুঁজিবাজারের প্রতি আস্থার সংকটও গভীর হয়েছে।
২০২৬ সালের শুরুতে তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ‘টেডপিক্স’ প্রায় ৪৫ লাখ পয়েন্টে পৌঁছেছিল। তবে জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষের প্রাণহানির পর বাজারে বড় ধস নামে। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় ২০ দিনের রাষ্ট্রীয় ইন্টারনেট বন্ধের কারণে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়তে থাকলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত অর্থ তুলে নিতে শুরু করেন। বাজার বন্ধ হওয়ার আগে সূচক নেমে আসে প্রায় ৩৭ লাখ পয়েন্টে।
পুনরায় বাজার চালুর পরও অধিকাংশ ইরানি নাগরিক সঞ্চয় বিদেশি মুদ্রা, স্বর্ণ, আবাসন, গাড়ি কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিকল্প সম্পদে ধরে রাখতে চাইবেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ দেশটির অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার চাপে রয়েছে।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজেট ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত অর্থ ছাপাচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ। গত ১৩ এপ্রিল ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ আরোপ করা হয়, যদিও তার পাঁচ দিন আগে উভয় পক্ষ একটি নাজুক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল।
যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হা’\মলায় ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত, খনিশিল্প ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব প্রতিষ্ঠান দেশটির পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে।
তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে কোম্পানিগুলো ক্ষয়ক্ষতির কতটা তথ্য প্রকাশ করতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ইরানের আর্থিক দৈনিক ‘দোনিয়া-ই-এক্তেসাদ’ জানিয়েছে, উৎপাদন প্রক্রিয়া, নকশা বা কারখানার মানচিত্রের মতো কিছু তথ্য ‘বাণিজ্যিক গোপনীয়তা’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ধরনের তথ্য সরাসরি প্রকাশ না করে প্রথমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া হতে পারে।
এসইও চেয়ারম্যান হোজ্জাতুল্লাহ সাইয়্যেদি (Hojjatollah Sayyedi) জানিয়েছেন, বাজার পুনরায় চালুর সময় কোম্পানিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হবে। প্রথমত, সরাসরি যুদ্ধের ক্ষতির শিকার প্রতিষ্ঠান; দ্বিতীয়ত, সরবরাহকারী, গ্রাহক বা সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানি; এবং তৃতীয়ত, সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান।
ভিয়েনাভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইউরেশিয়ান নেক্সাস পার্টনার্সের ব্যবস্থাপনা অংশীদার বিজান খাজেহপুর (Bijan Khajehpour) আল-জাজিরাকে বলেন, বাজার পুনরায় চালুর পুরো প্রক্রিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কারণ অনেক বিনিয়োগকারী দ্রুত নগদ অর্থ সংগ্রহের জন্য আতঙ্কিত হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে পারেন।
ইরানের শেয়ারবাজারে মূল্য ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে দৈনিক তিন শতাংশ সীমা আগে থেকেই রয়েছে। ফলে কোনো শেয়ারের দাম একদিনে আগের দিনের তুলনায় তিন শতাংশের বেশি বাড়তে বা কমতে পারে না। এই সীমা হঠাৎ ধস ঠেকাতে সহায়ক হলেও বিক্রির চাপ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় দুই সপ্তাহ বাজার বন্ধ থাকার অভিজ্ঞতা এবারের পরিস্থিতি বোঝাতে পারে। ওই যুদ্ধের পর কয়েক সপ্তাহে তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ১৫ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। যদিও পরে ২০২৬ সালের শুরুতে সূচক আবার রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সেই উত্থান প্রকৃত বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা অর্থনৈতিক শক্তির প্রতিফলন ছিল না; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে সম্পদের পুনর্মূল্যায়নের ফল ছিল।


