আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনে মোট ২,৫৬৯ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, যার মধ্যে মাত্র ১০৭ জন নারী। মোট প্রার্থীর বিপরীতে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যাচাই-বাছাই শেষে এই সংখ্যা চূড়ান্ত হবে।
এই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো থেকে মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও অত্যন্ত সীমিত। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী প্রার্থী এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করছেন। ইসির তথ্য অনুযায়ী, ১০৭ নারী প্রার্থীর মধ্যে ৪০ জনই স্বতন্ত্র—যা মোট নারী প্রার্থীর এক–তৃতীয়াংশের বেশি।
তালিকায় শীর্ষে বিএনপি
প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি নারী প্রার্থী দিয়েছে—১৩টি আসনে ১০ জন নারী প্রার্থী। এর মধ্যে সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর কারণে এখন কার্যত দলের নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৯–এ নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শতকরা হিসাবে তা মাত্র ৩%।
বিএনপির মতো দেশের অপর প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনে কোনও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। তবে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার বলেছেন, তারা সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেবে।
নতুন দল, ভিন্ন বার্তা
তরুণদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ৪৭ জন প্রার্থীর মধ্যে তিনজন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে ৬ শতাংশের বেশি হারে পৌঁছেছে, যা বড় দলগুলোর তুলনায় কিছুটা বেশি। তবে জামাতের সাথে তাদের জোটের হিসাবে এই সংখ্যা মাত্র ১%।
বামধারার দলগুলোর মধ্যেও নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) এককভাবে ১০ জন এবং বাসদ আরও ৪ জন নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ৬ জন করে নারী প্রার্থী দিয়েছে।
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর অবস্থান
ধর্মভিত্তিক বেশিরভাগ দল এবারও নারী প্রার্থী দেয়নি। তবে ব্যতিক্রম ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ। দলটির দফতর সম্পাদক মাইনউদ্দিন টিটো বলেন, “আমরা মানবতার ভিত্তিতে গঠিত দল। রাষ্ট্র যেহেতু সবার, রাজনৈতিক দলকেও সবার প্রতিনিধিত্ব করতে হবে।”
প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি
জাতীয় পার্টি (জিএম কাদের) পাঁচজন, গণসংহতি আন্দোলন চারজন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি) তিনজন এবং গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) তিনজন নারী প্রার্থী দিয়েছে। তবে সাতটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কেবল একজন করে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, যা মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ‘প্রতীকী অন্তর্ভুক্তি’।
শহরাঞ্চলে নারী প্রার্থী বেশি
আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শহর ও আধা-শহরাঞ্চলে নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে ঢাকা-৭, ঢাকা-১২, চট্টগ্রাম-১০ এবং নেত্রকোণা-৪ আসনে একাধিক নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সাংবিধানিক অধিকার বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
সংবিধানে সমান রাজনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা থাকলেও সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও সীমিত। বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় দলগুলো এখনো ‘জেতার সম্ভাবনাময়’ আসনগুলোতে নারী প্রার্থী দিতে অনাগ্রহী।
জুলাই সনদ ও নারী অংশগ্রহণ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের (এনসিসি) প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’-এ উল্লেখ করা হয়, সংসদে নির্বাচিত সদস্যদের অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের পাশাপাশি সাধারণ আসনে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
কিন্তু এবারকার মনোনয়ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি কেউই ৫ শতাংশের বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে পারেনি। ব্যতিক্রম এনসিপি।
🔹 এক নজরে নারী প্রার্থীদের পরিসংখ্যান
– স্বতন্ত্র ৪০
– বিএনপি: ১৩
– বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী): ১০
– ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ: ৬
– জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি): ৬
– জাতীয় পার্টি: ৫
– বাসদ: ৪
– গণসংহতি আন্দোলন: ৪
– জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): ৩
– গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি): ৩
– গণফোরাম: ২
– ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি): ২
– বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি: ২
– জাতীয় পার্টি (জেপি): ১
– ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ: ১
– নাগরিক ঐক্য: ১
– বাংলাদেশ লেবার পার্টি: ১
– বাংলাদেশ রিপাবলিক পার্টি: ১
– বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি): ১
– বাংলাদেশ মুসলিম লীগ:** ১


