বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলেও ঢাকা-১৮ আসনে প্রার্থী হিসেবে তাকে বৈধ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এক আসনে মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও আরেক আসনে বিএনপি জোটের দীর্ঘদিনের শরিক দলটির প্রধানের মনোনয়নপত্র বৈধ থাকার বিষয়টি নিয়ে জনমনে কৌতুহল তৈরি হয়েছে।
কী কারণেইবা এক আসনে বাতিল হল, আরেকটিতে ঠিক থাকল তা নিয়ে চলছে ভোটের আলোচনা।
কোন প্রার্থীর মনোনয়ন এক আসনে বৈধতা পেলেও অন্য আসনে তা অবৈধ হওয়াটা স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী।
তার মতে, ভিন্ন ভিন্ন কারণে এটি হতেই পারে। এর এখতিয়ার রিটার্নিং কর্মকর্তার।
আর তার মনোনয়নপত্র বাতিল করার প্রসঙ্গে মান্না সাংবাদিকেদের কাছে অভিযোগ করেন, ‘জোর করে ও মব করে’ বৈধ প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল ‘করা হচ্ছে’ বলে দাবি করেছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।
শনিবার সন্ধায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি এই দাবি করেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের বলেন, “আমি এর আগেও আরও তিন/চারবার নির্বাচন করেছি। এইরকম কঠিন হতে দেখিনি কোন পথ। এবং এই কারণেই বিশেষ করে আজকের যে নির্বাচন কমিশন আমাকে বৈধ ঘোষণা করেছে তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিই।
“কারণ হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন যারা যেখানে যতটুকু দায়িত্ব পালন করেন, তাদের যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করবার ওপরেও একটা গুণমান সম্পন্ন সুষ্ঠ, সবার কাছে মোটামুটিভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব।”
নির্বাচন কমিশনে ‘চাপ প্রয়োগ’ করে মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে দাবি করেন বিএনপি জোটের এই প্রার্থী বলেন, “চাপ তৈরি করে, মব করে যদি নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করা যায়, তাহলে সেই নির্বাচন কোন গুণমান পেতে পারে না। যেজন্যই এতগুলো শহীদ জীবন দিলেন, এত বড় আন্দোলন হল, সেগুলোর কোনো মূল্য থাকে না।”
মনোনয়নপত্র বাতিল ও বৈধ করার আগেও ঋণ খেলাপির তালিকায় নাম থাকার বিষয়টি নিয়েও আলোচনায় আসেন আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে আলাদা রাজনৈতিক দল গঠন করা এ রাজনীতিক।
এর আগে ঋণ খেলাপির তালিকায় নাম থাকায় তার ভোটের পথ আটকেছিল। ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ঋণ খেলাপির তালিকা থেকে নাম কাটানোর জন্য তিনি হাই কোর্টে আবেদন করলে তা খারিজ হয়ে যায়। পরে চেম্বার আদালতে গিয়ে ফিরে পান তিনি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের মধ্যে শুক্রবার বিকালে খবর আসে বগুড়া-২ আসনের প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিলের।
জোটের শরিক হিসেবে এ আসন নাগরিক ঐক্যের জন্য ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি।
পরে বিকালে ঢাকা-১৮ আসনে মান্নার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণায করা হয়। ঢাকা উত্তর সিটির ১, ১৭, ৪৩ থেকে ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড ও বিমানবন্দর এলাকা নিয়ে এ আসন। এ আসনে বিএনপি দলীয় প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
ঢাকা মহানগরীর ১৩টি আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী মান্নার মনোনয়নপত্র বৈধ রাখার বিষয়ে বলেন, “হলফনামা ও আয়কর রিটার্নের তথ্যে অসামঞ্জস্যতার কারণে প্রথমে তার মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হলেও পরবর্তীতে সংশোধিত কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে তাকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।”
অপরদিকে বগুড়া-২ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান শুক্রবার বিকালে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেন।
বাতিলের কারণ হিসেবে তিনটি বিষয়ের কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, হলফনামার এফিডেভিটে একইদিনে আইনজীবী ও প্রার্থীর সই থাকতে হয়। কিন্তু মান্না যেদিন সই করেছেন, আইনজীবী তার একদিন আগেই সই করেছেন। মান্না যেসব মামলায় খালাস পাওয়ার কথা লিখেছেন, সেগুলোর কাগজপত্র দেননি। আর সম্পদের যে বিবরণী দিয়েছেন, তাতে ত্রুটি আছে।
শনিবার রাতে রিটার্নিং কর্মকর্তা তৌফিকুরের কাছে জিজ্ঞাসা করা হয় বগুড়ায় বাতিল হলেও ঢাকা-১৮ আসনে মান্নার মনোনয়নপত্র বৈধ হল কীভাবে?
এর উত্তরে তিনি বলেন, “উনি ওইখানে (ঢাকা-১৮) আলাদা হলফনামা দিতে পারেন। উনি যে দুই জায়গায় একই হলফনামা দিয়েছেন তা বলা যাচ্ছে না।”
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী বলেন, “রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব একটি আধা-বিচারিক প্রক্রিয়া। তাই কার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা হবে, কারটা হবে না তা সম্পূর্ণ রিটার্নিং কর্মকর্তার বিবেচনা। বগুড়া-২ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে যা বিবেচিত হয়েছে ঢাকা-১৮ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে তা বিবেচিত নাও হতে পারে।
“তাই উনি চাইলে (মাহমুদুর রহমান মান্না) বগুড়া-২ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আপিল করতে পারেন। এদিকে ঢাকা-১৮ তে উনি বৈধ বিবেচিত হচ্ছেন তা চাইলে কেউ চ্যালেঞ্জ করে আপিল করতে পারেন।”
হলফনামার এফিডেভিট প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, “হলফনামা হলো একটি লিখিত হলফ বা শপথ, যেখানে একজন ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে সত্যতা প্রমাণ করার জন্য ঘোষণা দেন। সাধারণত হলফনামা এফিডেভিট নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে করা হয়।”


