সংসদ নির্বাচনের ঘনঘটায় জটিল সমীকরণে জড়িয়ে পড়েছে বিএনপি (BNP)। বিভিন্নবার সতর্কতা ও দলীয় সিদ্ধান্তের পরও কিছু আসনে ঠেকানো যাচ্ছে না দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আসনে ধানের শীষের বিপরীতে মাঠে নেমেছেন বিএনপির পরিচিত মুখরা—অনেকে আবার জোটসঙ্গীদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনেও। বেশ কিছু আসনে বিদ্রোহী প্রাথীদের মননোউন বাতিল হলেও তাদের বেশ কয়েকজন আপিলের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে বিদ্রোহীদের সামাল দিতে সরাসরি হস্তক্ষেপে নামছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman)। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় ইতোমধ্যে বহিষ্কৃত হয়েছে দশজন, যাদের মধ্যে আছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির আরও চার সদস্যসহ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা। এমনটি বহিষ্কারের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন তিন বারের এমপিও। এদের নয়জনের বহিষ্কারের দিনটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ—বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দিন – যা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা – সমালোচনা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের আগামী সপ্তাহেই গুলশান কার্যালয়ে ডাকা হবে। সেখানে তারেক রহমান নিজে কথা বলবেন, দলের কৌশল, ভবিষ্যত ভাবনা এবং ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরবেন। প্রত্যাহারের আহ্বান জানাবেন। লন্ডন থাকাকালেও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে এক দফা বৈঠক করেছিলেন তিনি।
আসন পেয়ে মাঠে নামতে না পারা শরিকদের অনেকে বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে প্রভাব হারাচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ-৫, লক্ষ্মীপুর-১, কুমিল্লা-৭ ও ঝিনাইদহ-৪ আসনে যেসব প্রার্থী বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন, তারাও নিশ্চিত নন স্থানীয় সমর্থন নিয়ে।
বহিষ্কৃতদের তালিকায় রয়েছেন—ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ছাড়াও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, হাসান মামুন, আব্দুল খালেক, তরুণ দে, সাইফুল আলম নীরব, মামুনুর রশিদ ও মেহেদী হাসান পলাশ। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই জোটের সমঝোতার আসনে প্রার্থী হয়েছেন।
উদাহরণস্বরূপ, পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি নেতা হাসান মামুন প্রার্থী হয়েছেন গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের বিরুদ্ধে, যেখানে ইতিমধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আবার ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হককে সমর্থন দিলেও বিএনপির সাবেক মহানগর নেতা সাইফুল আলম নীরব মাঠে সক্রিয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ তে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তের প্রার্থীর বিরুদ্ধে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ তে গণসংহতির জোনায়েদ সাকির বিপরীতেও বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
সবচেয়ে জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বগুড়া-২ আসনে। নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না (Mahmudur Rahman Manna) এই আসনে ছাড় পেলেও মনোনয়ন বাতিল হয়ে গেছে, যদিও ঢাকা-১৮ আসনে তার মনোনয়ন বৈধ হয়েছে। কিন্তু তিনি বগুড়াতেই নির্বাচন করতে চান, আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
এই প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয় গুলশানে। বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে শোকবইয়ে স্বাক্ষর দিতে গিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ঢাকা-১২ আসনের জটিলতা ও সাইফুল আলম নীরবের তৎপরতা তুলে ধরেন তিনি। জবাবে তারেক রহমান আশ্বাস দেন—বিদ্রোহীদের ডেকে সরাসরি কথা বলবেন এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেবেন।
বৈঠকে আলোচনায় আসে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও দক্ষিণপন্থিদের হঠাৎ উত্থান। তারেক রহমান আগের অবস্থানে অনড় থেকে জোট ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার তাগিদ দেন। মব সন্ত্রাস ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বৈঠক শেষে সাইফুল হক জানান, নির্বাচন যেন সহিংসতায় না গড়ায়, বিভাজন তৈরি না হয়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। ৩১ দফা দাবিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক প্রস্তাবনা নিয়েও কথা হয়েছে। উপস্থিত ছিলেন পার্টির বহ্নিশিখা জামালী ও আকবর খানসহ আরও কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা।
এদিকে জোটের হতাশা প্রশমনে আশ্বাস দিয়েছে বিএনপি। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Amir Khasru Mahmud Chowdhury) জানিয়েছেন, ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই বিদ্রোহীরা সরে আসবেন। অন্য সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।


