জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে বিশাল সবুজ চত্বরে ৪৪ বছর ধরে চিরনিদ্রায় শায়িত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এবার সেখানেই তার সঙ্গী হলেন সহধর্মিণী তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া। অথচ ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা প্রতিহিংসার জেরে ইতিহাসের সাক্ষী এ সমাধি সৌধ সরাতে একাধিকবার চেষ্টা করেছিলেন। কবরে জিয়াউর রহমানের লাশ নেই দাবি করে বিতর্কও সৃষ্টি করেছিলেন।
জিয়াউর রহমানের সমাধি সরানোর নীলনকশা হিসেবে ‘ঢাকার শেরে বাংলানগরে জাতীয় সচিবালয় নির্মাণ’ প্রকল্প নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালে প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনও করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ২০৯ কোটি টাকা।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় রক্ষা পেয়েছে জিয়াউর রহমানের সমাধি। প্রকল্পেরও আর কোনো হদিস নেই পরিকল্পনা কমিশনে। প্রকল্প গায়েব হয়ে গেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) কবির আহামদ বলেন, ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সচিবালয় নির্মাণ’ প্রকল্প আমার চোখে পড়েনি। এটা কোথায় আছে বা কী আছে আমার কিছুই জানা নেই। এটা সম্পর্কে আমি কিছু জানিও না।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা-৩) খলিল আহমেদ বলেন, ‘প্রকল্পের এখন কোনো খবরও নেই, নড়াচড়াও নেই।’
১৯৮১ সালের ২ জুন জিয়াউর রহমানকে দাফন
লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম (১৯৩৬-১৯৮১) ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সেনাপ্রধান এবং বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা। সেই সঙ্গে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
রাষ্ট্রপতি থাকাবস্থায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল সেনা সদস্য জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। প্রথমে তাকে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পাহাড় এলাকায় দাফন করা হয়। পরে তখনকার সরকারের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় জিয়াউর রহমানের দেহাবশেষ ওই বছরের ১ জুন ঢাকায় আনা হয়। পরদিন ২ জুন শেরেবাংলা নগরে লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে জিয়াউর রহমানের জানাজা হয়। জানাজা শেষে সংসদ ভবনের উত্তর পাশের উদ্যানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়।
বারবার উদ্যানের নাম পরিবর্তন, বেইলি ব্রিজ অপসারণ
জাতীয় সংসদ ভবনের উত্তর পাশের উদ্যানটি একসময় ক্রিসেন্ট লেক পার্ক হিসেবে পরিচিত ছিল। যদিও কবে এবং কীভাবে স্থানটির নাম ক্রিসেন্ট লেক হয়, তা জানা যায়নি। ১৯৮৮ সালের ২০ ডিসেম্বর স্থাপত্য অধিদপ্তরের নির্দেশে পার্কটির নামফলকে ‘চন্দ্রিমা’ শব্দটি যুক্ত করা হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চন্দ্রিমা উদ্যানের নাম পরিবর্তন করে জিয়া উদ্যান রাখা হয়। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার এসে ওই বছরের ২৪ অক্টোবর নাম আবার চন্দ্রিমা উদ্যান রাখে। পাশাপাশি জিয়াউর রহমানে সমাধিতে যাওয়ার জন্য ক্রিসেন্ট লেকে স্থাপন করা বেইলি ব্রিজও অপসারণ করে।
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে পার্কটির নাম আবার জিয়া উদ্যান রাখে। সেখানে কংক্রিটের ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পাশাপাশি একটি কমপ্লেক্স গড়ে তোলে। কমপ্লেক্সের চারদিকে চারটি প্রবেশপথের মধ্যে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু, সম্মেলন কেন্দ্র, মসজিদসহ চারটি স্থাপনা।
জিয়াউর রহমানের সমাধি সরানোর পরিকল্পনা
১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সময় শেরেবাংলা নগরে ১০টি ব্লকে ১৪তলা ভিতের ওপর চারটি নয়তলা ভবনসহ অফিস, ব্যাংক, মিলনায়তন, মসজিদ, এক হাজার গাড়ি পার্কিং সংবলিত জাতীয় সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের ডেভিড উইজডম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিও হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। ২০০১ সালে সেখানকার ১০ একর জমিতে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এতে সচিবালয়ের জন্য নির্ধারিত জমি কমে দাঁড়ায় ৩২ একর।
১৯৯৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণ প্রকল্প নেয়নি। ২০০৯ সালে আবারও ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১০ সালের ৩ মার্চ আবার জিয়া উদ্যানের নাম বদলে চন্দ্রিমা উদ্যান করে তারা। এরপর সেখানে সচিবালয় স্থানান্তরের কথা বলে জিয়াউর রহমানের কবর স্থানান্তরের নীলনকশা আঁকেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ২ জুনের বৈঠকে তিনি সংসদ ভবন সংরক্ষণে মূল নকশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়-এমন কিছু না রাখার বিষয়ে মত দেন। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলারও পরামর্শ দেন তিনি।
জিয়ার সমাধি সরাতে চেয়েছিলেন হাসিনা, নেন ২২০৯ কোটি টাকার প্রকল্প
মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধি সৌধ, ফাইল ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল
২০১৪ সালে বিনা ভোটের নির্বাচনে আবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে জিয়াউর রহমানের সমাধি সরাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। গ্রহণ করেন ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সচিবালয় নির্মাণ’ প্রকল্প। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ২০৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পের আওতায় ৩২ একর জমিতে চারটি ব্লকে ভাগ করে জাতীয় সচিবালয় কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছিল। দুটি বড় ব্লকে ৩২টি বড় মন্ত্রণালয় এবং দুটি ছোট ব্লকে ১৬টি ছোট মন্ত্রণালয়কে স্থানান্তরের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল। যেখানে থাকার কথা ছিল মিলনায়তন, সম্মেলন কেন্দ্র, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, মসজিদ, কার পার্কিং ইত্যাদি।
শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সচিবালয় নির্মাণের একটি প্রস্তাব ২০১৫ সালের ৬ জুন পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক-মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় তোলা হয়। কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করায় সে সময় বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন আপত্তি জানায়।
শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় নির্মাণ করতে হলে জাতীয় সংসদ ভবনের উচ্চতার বেশি হতে পারবে না। জাতীয় সংসদের উচ্চতা ১৫০ ফুট। জাতীয় সংসদের স্থপতি লুই আই কানের নকশা বাঁচিয়ে ওই এলাকার উন্নয়ন করতে হলে অবশ্যই প্রস্তাবিত সচিবালয়ের ভবনগুলো নয় তলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কিন্তু নতুন সচিবালয় নয় তলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
জিয়ার সমাধি সরাতে চেয়েছিলেন হাসিনা, নেন ২২০৯ কোটি টাকার প্রকল্প
মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধি সৌধ, ফাইল ছবি: বিএনপির মিডিয়া সেল
আর ভবনগুলো নয় তলার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে সব মন্ত্রণালয়কে জায়গা দেওয়া সম্ভব হবে কি না তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে পরিকল্পনা কমিশন।
অন্যদিকে নতুন সচিবালয়ের উচ্চতা নয় তলার বেশি হলে পাশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে বলে সভায় মত দেওয়া হয়। বিশেষ করে গণভবনের চারপাশে আইটি সিকিউরিটি বাড়ানোসহ বেশ কিছু পরামর্শ ওই সভায় দেওয়া হয়। এসব সমস্যার সমাধানের উপায়সহ বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) উল্লেখ করার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে কমিশন।
কমিশন মনে করে, জাতীয় সংসদ ভবনের সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রস্তাবিত সচিবালয়ের আউটলুক সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। এছাড়া ঢাকা শহরে উম্মুক্ত স্থানের খুব অভাব, যদিও বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে যাওয়ার জন্য খালি জায়গা দরকার।
নতুন সচিবালয় নির্মাণের আগে এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। শহরের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা ও বিভিন্ন পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে অন্য কোনো সুবিধাজনক স্থানে নতুন সচিবালয় নির্মাণের পক্ষে মত দেয় কমিশন। পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি সত্ত্বেও শেখ হাসিনার নির্দেশনায় পরের জুলাই মাসে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়।
একনেকে আটকে যায় প্রকল্প
২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ‘ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সচিবালয় নির্মাণ’ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশা না থাকায় প্রকল্পের অনুমোদন না দিয়ে তা ফেরত পাঠানো হয়।
সংসদ ভবন কমপ্লেক্স ও আশপাশের এলাকা নিয়ে লুই আই কানের তৈরি মূল নকশা এনে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা দেন শেখ হাসিনা। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মূল নকশা আনার জন্য চার লাখ ডলার বরাদ্দ দেয় সরকার।
বৈঠক শেষে তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের বলেন, নতুন সচিবালয় নির্মাণ প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের জন্য গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে ফেরত দেওয়া হয়েছে। লুই আই কানের নকশা অপরিবর্তিত রেখে পরিকল্পনা তৈরি করে একনেকে আবার উত্থাপন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে লুই আই কানের প্রধান নকশা নিয়ে আসার নির্দেশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
স্থপতি লুই কান ১৯৬২ সালে ঢাকায় সংসদ ভবন কমপ্লেক্স ও আশপাশের এলাকা নিয়ে যে নকশা করেছিলেন, সেটি যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত আছে বলে জানান মুস্তফা কামাল।
সমাধিতে জিয়াউর রহমানের লাশ থাকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি
জিয়াউর রহমানের কবর সরানোর জন্য প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি সেখানে তার লাশ থাকা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি করেন শেখ হাসিনা। এমনকি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য বিএনপি নেতাকর্মীদের দফায় দফায় বাধা দিয়েছে তার সরকার। শেখ হাসিনার তার ফুপাতো ভাই ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে দিয়ে একটি প্রস্তাব তোলেন সংসদ অধিবেশনে। প্রস্তাবটি হচ্ছে- ‘জাতীয় সংসদ ভবনের মূল স্থপতি লুই আই কানের নকশা ফিরিয়ে আনা এবং সংসদ ভবন এলাকা থেকে নকশাবহির্ভূত স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া’।
সেদিন তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন সংসদে বলেন, কবর তো বনানী, আজিমপুর বা মিরপুর কবরস্থানে হওয়ার কথা। কবর জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় হবে কেন? তাছাড়া লুই আই কানের নকশার কোথাও শেরেবাংলা নগরে কবরস্থানের জন্য জায়গা নির্ধারিত ছিল না।
২০১৫ সালের ১৬ নভেম্বর জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির এক প্রশ্নের উত্তরে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, জিয়াউর রহমানের কবর সরিয়ে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সেক্টর কমান্ডারদের জন্য সংরক্ষিত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে।
২০২১ সালের ১৭ আগস্ট বিএনপির নেতাকর্মীরা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় তাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এরপর ২৬ আগস্ট ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবরে গিয়েও ওই যে মারামারি করল বিএনপি…বিএনপি জানে না যে সেখানে জিয়ার কবর নাই? জিয়া নাই ওখানে? জিয়ার লাশ নাই? তারা তো ভালোই জানে। তাহলে এত নাটক করে কেন? খালেদা জিয়াও ভালোভাবে জানে। খালেদা জিয়া বা তারেক জিয়া কি বলতে পারবে যে তারা তার বাবার লাশ দেখেছে? গুলি খাওয়া লাশ তো দেখাই যায়। তারা কি দেখেছে কখনও? বা কোনো একটা ছবি দেখেছে কেউ? দেখেনি। কারণ ওখানে কোনো লাশ ছিল না।’
শেখ হাসিনা দাবি করেন, ‘ওখানে একটা বাক্স আনা হয়েছিল। আর সেখানে ওই বাক্সের ফাঁক থেকে যারা দেখেছে একটু…সেই এরশাদের মুখ থেকেই শোনা, কমব্যাট ড্রেস পরা ছিল। কারণ জিয়াউর রহমান তো তখন প্রেসিডেন্ট। তখন তো সে কমব্যাট ড্রেস পরে না। এটা কি বিএনপির লোকেরা জানে না?’
শেখ হাসিনার এ বক্তব্যের পর দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা একই ধরনের বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ২৮ আগস্ট ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, সংসদ ভবন এলাকায় চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়ার কবরে তার মৃতদেহ ছিল না এবং ওই কবরসহ সংসদ ভবনের মূল নকশার বাইরে যত স্থাপনা সব সরিয়ে ফেলার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও এক অনুষ্ঠানে বলেন, যে জানাজায় হাজার হাজার লোক হলেও ওই কবরে জিয়া নেই। এর পরের মাসেই ১৬ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতারা জাতীয় সংসদে দাবি করেন, উদ্যানের সমাধিতে জিয়াউর রহমানের লাশ নেই।
সেদিন বিএনপির সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন সংসদে বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের লাশ সেখানে আছে কি নাই, সেটা বড় বিষয় নয়। সেখানে যে লাশ নাই, তা আপনারা (আওয়ামী লীগ) কীভাবে জানলেন? এত বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন, এটা নিয়ে আগে কথা বলেননি কেন? এখন কেন বলছেন?’
পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ নেই, সেটা ৪০ বছর আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছে। ১৯৮১ সালের ২০ জুন আমি নিজেই সংসদে বলেছিলাম জিয়ার লাশের ছবি প্রকাশ করতে। কিন্তু তা করতে পারেনি।’
স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে শেখ সেলিম বলেন, ‘ওখানে যে বাক্সটা আছে, তা সরিয়ে লুই আই কানের নকশা বাস্তবায়ন করেন।’
আওয়ামী লীগের এই জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য বলেন, জিয়ার লাশ থাকলে তার স্ত্রী-সন্তানকে দেখানো হয়নি কেন? যদি লাশ থেকে থাকে, আগামী এক মাসের মধ্যে প্রমাণ দিতে হবে। ভবিষ্যতে সংসদে লাশ নিয়ে যাতে কোনো কথা না হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে তিনি স্পিকারকে অনুরোধ করেন।
বিএনপির এমপি হারুনুর রশীদ বলেন, সংসদের লবিতে পবিত্র কোরআনের আয়াত লেখা আছে, ‘তোমরা জানা সত্ত্বেও সত্য গোপন করিও না এবং সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশ্রিত করিও না’।
তিনি বলেন, তখনকার সংসদে আওয়ামী লীগের ৩৯ জন সদস্য ছিলেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জিয়াউর রহমানের জানাজায় তারাও উপস্থিত ছিলেন। সংসদে শোকপ্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের লাশের পোস্টমর্টেম হয়েছে, সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারও হয়েছে। এগুলো সত্য ঘটনা। অহেতুক কথা বলে সময় নষ্ট করার দরকার নেই।
হারুনের বক্তব্যের জবাবে তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, সংসদ ভবন নিয়ে লুই আই কানের যে নকশা, সেখানে কোথায় রয়েছে যে চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের লাশ দাফন করতে হবে? বেগম জিয়া স্বামী মনে করে সেখানে কাকে শ্রদ্ধা জানান? আপনারা দলের নেতা ভেবে সেখানে কাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন? ওখানে কি কারও মৃতদেহ আছে? নাকি অন্য কারও মৃতদেহ আছে?
বিএনপির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, সরকারের ব্যর্থতা, ভোট চুরি, গণতন্ত্রহীনতা ও বিভৎস লুটপাট থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিতেই এই বিতর্ক করা হচ্ছে।
লুই আই কানের মূল নকশা ঢাকায়
২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর লুই আই কানের আঁকা জাতীয় সংসদ ভবনের মূল নকশার অনুলিপি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে এসে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির আর্কাইভ থেকে ৪১টি বাক্সে নকশাগুলো এনে জাতীয় সংসদের আর্কাইভে রাখা হয়।
নকশা আনা হলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হবেন-এমন আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের সমাধি সরানোর সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেন শেখ হাসিনা। এরপর ২০২২ সালের ২৩ নভেম্বর নতুন পরিকল্পনা করেন তিনি। শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন জায়গায় নতুন পার্ক বানানোর পরিকল্পনা নেয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। রমনা পার্কের মতো সেখানে সাধারণ মানুষের জন্য হাঁটাচলা, খেলাধুলাসহ সব ধরনের সুবিধা রাখা হবে বলে জানানো হয়। এজন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। ওই প্রকল্পেরও এখন হদিস নেই।


