আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা ও সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বক্তারা। তাঁদের মতে, এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশন ও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ, সক্ষমতা—এমনকি সদিচ্ছারও ঘাটতি স্পষ্ট।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আজ মঙ্গলবার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের জন্য মুক্ত আলোচনা: ডিজিটাল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তা প্রসঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই ইতিমধ্যে নৈরাজ্য ও বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং প্রার্থীদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর ঘটনা উদ্বেগজনক।
সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য এ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি মন্তব্য করে দেবপ্রিয় বলেন, কিন্তু সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে এ নিয়ে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ এখনো চোখে পড়ছে না।
সিপিডি বিশেষ ফেলো বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, অভিযোগ দাখিল ও ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সুযোগ ছিল, যা কাজে লাগানো হয়নি। নাগরিকেরা দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ চান, তবে গণতন্ত্র ছাড়া নিয়ন্ত্রণ বিপজ্জনক হতে পারে—নেপালের অভিজ্ঞতা সেটাই দেখায়।
দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, রাজনীতি ও গণতন্ত্র—কোনোটির জন্যই সহায়ক নয় বলে মনে করেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা মেরুকরণ ও বিভাজনের রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করছি। এ সংকট মোকাবিলা না করলে নির্বাচন করা গেলেও মুক্তি মিলবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, ‘দুর্নীতি বা ঘুষ থেকে বের হওয়ার একটি রাস্তা হলো ডিজিটালাইজেশন। ফ্যাক্টরিতে সিসি ক্যামেরা থাকায় অনেক সুবিধা হয়েছে আমাদের, সহজেই সব দেখা যায়।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, ‘আমরা যতই অটোমেশন, ডিজিটালাইজেশন করতে চাই না কেন, মানুষের মানসিকতা না বদলালে তাতে কোনো লাভ হবে না।’
একই কথা বলেন ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান সবুর খান। তাঁর মতে, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাচ্ছি না। আমরা অসুস্থ জাতি হয়ে যাচ্ছি।’
ডিসিসিআইএর সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল দক্ষতা ও স্বাক্ষরতা বাড়াতে হবে। ডিজিটাল অবকাঠামোতে কাজ করতে হবে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে হবে।
ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলিলী বলেন, অর্থনীতি চালাতে হলে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। উদ্যোক্তাদেরকে সুযোগ দিতে হবে বা তাঁদেরকে বলতে হবে।
ডিজিটাল অগ্রগতি সব দেশেই হচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার কারণ নেই মন্তব্য করে সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, ‘আমাদের ৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছে। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারী হলো সাড়ে ৬ কোটি। এগুলো ভালো জিনিস; কিন্তু এর মধ্যে সমস্যা আছে।’
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সভাপতি আবদুল হক, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম জাহিদ এবং সিটি ব্যাংকের অ্যাসোসিয়েট রিলেশনশিপ ম্যানেজার তানহা কেট এবং উদ্যোক্ত তাজমিন নাসরিন ও আবিদা সুলতানা।


