জোটের শরিক দলগুলোর জন্য আসন ছেড়ে দেওয়ার পরও সেই আসনে বিএনপি নেতাদের বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া এবং দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচন চালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জোটে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী মাঠে বিভ্রান্তি, সমন্বয়ের অভাব ও আস্থার সংকট নিয়ে সরাসরি তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মিত্র দলের শীর্ষ নেতারা।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে আসন ভাগাভাগির যে সমঝোতা হয়েছিল, তা এখন মারাত্মক চাপে। অন্তত ১৪টি আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দিলেও এর মধ্যে ছয়টি আসনে সদ্য বিএনপি-তে যোগ দেওয়া নেতারা মনোনয়ন পেয়েছেন। এছাড়া বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে একাধিক আসনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ বাড়ছে।
নাগরিক ঐক্য (Nagarik Oikya) সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না সবচেয়ে বড় বিরোধিতার মুখে পড়েছেন বগুড়া-২ আসনে। তার অভিযোগ, বিএনপি হাইকমান্ড তাকে ওই আসন থেকে নির্বাচন করতে বললেও মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় জেলা বিএনপি নেতারা ও এক আইনজীবী সরাসরি বাধা দেন। সব বাধা পেরিয়ে পরে জানতে পারেন, যারা তাকে বাধা দিয়েছেন, তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বগুড়া-২ আসনের বিষয়ে দলীয় সূত্র জানায়, প্রথমে সেটি নাগরিক ঐক্যের জন্য ছাড়লেও পরে ‘আইনি জটিলতার’ কারণ দেখিয়ে সেখানে নিজস্ব প্রার্থী দেয় বিএনপি। এতে করে মান্না চরমভাবে অসন্তুষ্ট হন এবং অভিযোগ জানান।
গণঅধিকার পরিষদ (Gono Odhikar Parishad) থেকে পদত্যাগ করে বিএনপি-তে যোগ দেওয়া রাশেদ খান ঝিনাইদহ-৪ আসনে ভিন্ন ধরনের চাপে আছেন। তার দাবি, সেখানে এক বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা তাকে হুমকি দিচ্ছেন, এমনকি নির্বাচনি অফিস ভাড়া করতেও বাধা দিচ্ছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকিও পেয়েছেন বলে জানান। এই অবস্থায় তিনি দলের হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।
সমঝোতার আওতায় বিএনপি যে আটটি আসনে প্রার্থী দেয়নি, সেগুলো হলো: ঢাকা-১২, ভোলা-১, পটুয়াখালী-৩, সিলেট-৫, নীলফামারী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬। আর শরিকদের নেতাদের ধানের শিস মার্কা দিতে দলে ভিড়িয়ে যেসব আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো: ঝিনাইদহ-৪, হবিগঞ্জ-১, কুমিল্লা-৭, কিশোরগঞ্জ-৫, লক্ষ্মীপুর-১ এবং ঢাকা-১৩।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি (Revolutionary Workers Party) সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ঢাকা-১২ আসনে তাদের জন্য আসন ছাড়ার পরও এক বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। তিনি সরাসরি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমস্যাটি জানিয়েছেন এবং সমাধানের আশ্বাস পেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
জমিয়াতে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (Jamiat Ulema-e-Islam Bangladesh)-এর সঙ্গেও বিএনপি চারটি আসন ভাগ করেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সেই আসনগুলোতেও বিএনপি নেতা-কর্মীরা সহযোগিতা করছেন না। নীলফামারী-১ আসনে জমিয়াতের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, পরিস্থিতি শরিকদের জন্য বিব্রতকর এবং এতে জোটের ঐক্য প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন পাওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদা আশাবাদী, তৃণমূল নেতারা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত মেনে চলবেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে জোনায়েদ সাকি (Zonayed Saki) বিএনপি-র সমর্থনে প্রার্থী হলেও এক বহিষ্কৃত নেতা মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন, যা পরে বাতিল হয়। সাকি বলেন, দলের ঐক্য রক্ষায় সকলের উচিত কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা।
হবিগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী হওয়া রেজা কিবরিয়া (Reza Kibria) মনে করেন, ব্যক্তিস্বার্থ বনাম দলীয় স্বার্থ—এই বিভাজন স্পষ্ট। পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপি গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর (Nurul Haque Nur)-এর জন্য আসন ছেড়ে দিলেও সেখানে একজন বিদ্রোহী বিএনপি নেতা প্রার্থী হয়েছেন।
বিএনপি-র যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ প্রার্থী হলে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের বিধান রয়েছে। ইতোমধ্যে এমন নয়জন বিদ্রোহী প্রার্থীকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিএনপি জোটের ভেতরে যে দ্বন্দ্ব এবং টানাপোড়েন চলছে, তা কেবল নির্বাচনের ফলাফল নয়, বরং জোটের ভবিষ্যৎ আস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। শরিকরা এখন তাকিয়ে আছেন তারেক রহমানের দিকেই, যিনি হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন।


