সাধারণ সদস্য থেকে চেয়ারম্যান: তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের চোরাই উৎরাইয়ের ধারাবাহিক ইতিহাস

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের পথচলা কেবল একটি দলের নেতৃত্বে পৌঁছানোর গল্প নয়; এটি তৃণমূল থেকে উঠে আসা এক দীর্ঘ, বন্ধুর এবং ঘটনাবহুল রাজনৈতিক অভিযাত্রা। সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগদান থেকে শুরু করে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ—এই পুরো সময়জুড়ে তাঁর জীবন জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, আন্দোলন, নিপীড়ন, নির্বাসন এবং পুনরুত্থানের সঙ্গে।

১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তারেক রহমান। মু’\ক্তি’\যু’\দ্ধে’\র সময় বাবা-মা ও ভাইসহ তাঁকেও গ্রেপ্তার করা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য গ্রেপ্তার হওয়া সর্বকনিষ্ঠ কারাবন্দীদের একজন হিসেবে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন। শৈশবেই রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক মানস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে।

ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন। তবে রাজনৈতিক ডামাডোলে পড়াশোনা শেষ না করেই সেখান থেকে তাকে বের হয়ে আসতে হয়।। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের পাতানো নির্বাচনের বিরুদ্ধে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি প্রথমবার প্রকাশ্যে স্বৈরাচারবিরোধী অবস্থান নেন। এর পরপরই তাঁকে একাধিকবার গৃহবন্দী করা হয়।

১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party–BNP)-এ যোগ দেন তারেক রহমান। নব্বইয়ের দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজপথে অংশ নেন এবং তৃণমূল সংগঠক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। এই আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা এইচ এম এরশাদ সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি মায়ের সঙ্গে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় প্রচারণা চালান। নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পেছনে তাঁর সাংগঠনিক তৎপরতা ছিল দৃশ্যমান। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা ইউনিটে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের আয়োজন করে তিনি দলীয় গণতন্ত্রের একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে স্থানীয় সমস্যা ও সুশাসন নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকায় একটি অফিস স্থাপন করেন তারেক রহমান। বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে তিনি দলীয় নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও তিনি কোনো মন্ত্রিত্ব বা সংসদ সদস্যপদ গ্রহণ না করে তৃণমূলের ক্ষমতায়নে মনোনিবেশ করেন।

২০০২ সালে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশব্যাপী গণসংযোগ শুরু করেন। যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময়ের মাধ্যমে তিনি দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে একজন কার্যকর সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০০৭ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সামরিক শাসকদের বেআইনি ক্ষমতা দখলের পর ৭ মার্চ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে তাঁর ওপর চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। প্রায় ১৮ মাস কারাবন্দী থাকার পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সব মামলায় জামিন পেয়ে মুক্তি পান এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান।

২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কাউন্সিলে প্রচারিত বক্তব্যে তিনি বন্দিদশায় নির্যাতনের বর্ণনা দেন এবং তাঁকে হ’\ত্যা’\র ষ’\ড়য’\ন্ত্র করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন।

২০০৭ সালের পর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে ৮৪টি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয় এবং একতরফা রায়ে সাজা দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি দেশের বাইরে থেকেই দল পরিচালনা করতে থাকেন। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আদালত তাঁকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেয় এবং সাজা বাতিল করা হয়।

২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানসহ দেশে ফেরেন তারেক রহমান। প্রায় ১৮ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে তাঁকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়।

২০২৫ সালের এপ্রিল সংখ্যায় ব্রিটিশ সাপ্তাহিকী The Week তারেক রহমানকে নিয়ে ‘Destiny’s Child’ শিরোনামে কাভার স্টোরি প্রকাশ করে, যেখানে তাঁকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া (Begum Khaleda Zia) মারা গেলে দলের নেতৃত্ব শূন্য হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান।

সাধারণ সদস্য থেকে চেয়ারম্যান—তারেক রহমানের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে রয়েছে, যেখানে সংগ্রাম, সংগঠন এবং নেতৃত্ব একসূত্রে মিলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *