জামায়াতের জোট ভাঙ্গায় অনেকটাই ভারমুক্ত বরিশালের ২১ আসনে বিএনপি’র প্রার্থীরা

বরিশাল বিভাগে ভোটযুদ্ধে বড় ধাক্কা খেয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (Islami Andolan Bangladesh) ও জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami)। বিএনপির সঙ্গে ইসলামি ও সমমনা দলগুলোর জোট ভেঙে যাওয়ার পর বরিশালের সাতটি মূল আসনে এ দুটি দল কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে চলে গেছে। বাকি ১৪টি আসনেও তাদের প্রভাব প্রায় নিশ্চিহ্ন। জোট ভাঙনের এই ঘটনায় বরিশাল জয়ের পথে প্রায় একচেটিয়া সুবিধা পেয়ে গেছে বিএনপি (BNP)।

বছরের শুরুতে ইসলামি ও সমমনা আট দল নিয়ে যে জোট গঠিত হয়েছিল, তার নেতৃত্বে ছিল জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন। এই জোটে পরবর্তীতে এনসিপি, এবি পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল যোগ দেয়। ভোটের মাঠে এই জোটকেই বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরা হচ্ছিল। কিন্তু আসন ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের ফলে শেষ পর্যন্ত জোট ভেঙে যায়। শুক্রবার ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে এককভাবে ২৬৮ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জোট ভাঙার বড় ধাক্কা: বরিশালের ৭টি আসনে পতন

বরিশালের যে সাতটি আসনে বিএনপি ও ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জমজমাট লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, সেসব আসনে এখন জামায়াত ও চরমোনাইর দল কার্যত একা এবং দুর্বল হয়ে পড়েছে।

পিরোজপুর-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মরহুম দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী। এখানে মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী প্রথমবার এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র ২৮০ ভোটের ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি সাড়ে ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয় পান। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই আসনে জামায়াতের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে বিএনপি। তার ওপর জোট রাজনীতি থেকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সরে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে ভোটের মাঠে বিএনপিকে সামলানো জামায়াত প্রার্থীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

পিরোজপুর-২ আসনে জামায়াতের শামিম সাঈদী ছিলেন চরমোনাইর সমর্থন পেয়ে আত্মবিশ্বাসী। এই আসনে নিরপেক্ষ নির্বাচনে জামায়াত কখনোই ৩–৪ হাজারের বেশি ভোট পায়নি। এবার মরহুম দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী–এর পুত্র শামিম সাঈদী–কে ঘিরে তারা শক্ত অবস্থান গড়েছিল। ইসলামী আন্দোলনের ভোট যুক্ত হলে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারত। তবে জোট ভেঙে যাওয়ায় সেই সমীকরণ আর নেই। ফলে এই আসনে সহজ জয়ের অপেক্ষায় রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী আহম্মেদ সোহেল সুমন মঞ্জুর।

পটুয়াখালী-২ আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদেরও জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়েছে। এখানেও নিরপেক্ষ নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লার ৪–৫ হাজারের বেশি ভোটের নজির নেই। তবু ব্যক্তিগত ইমেজে মাসুদ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন, বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের ভোট যুক্ত থাকায়। কিন্তু জোট ভাঙায় সেই সুবিধা আর নেই। ’৯০–পরবর্তী সময়ে এখানে নিরপেক্ষ নির্বাচনে বিএনপি মাত্র একবার জিতেছে; আসনটি মূলত আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। সাম্প্রতিক দলবদলে শক্ত অবস্থানে থাকা বিএনপি প্রার্থী শহিদুল আলম তালুকদার–এর বিপরীতে এখন পরাজয়ের শঙ্কায় রয়েছেন মাসুদ।

পিরোজপুর-৩ আসনে ইসলামি আন্দোলনের প্রার্থী রুস্তুম আলী ফরাজীর আদর্শিক অবস্থান নিয়ে আগেই বিতর্ক ছিল। জামায়াতের ভোট না পাওয়ায় এখানে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন।

বরিশাল-৫, বরিশাল-৬পটুয়াখালী-৪—এই তিন আসনে ইসলামী আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি ছিল। বরিশাল সদর ও বাকেরগঞ্জে দলটির প্রার্থী নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল করিম। পটুয়াখালী-৪-এ বিএনপির সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান হাতপাখা প্রতীকে লড়ছেন। অতীতে এখানকার ভোটব্যাংকে জামায়াতেরও বড় অবদান ছিল। জোট ভাঙায় সেই সমর্থন হারানোয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার শক্তি কমে গেছে।

প্রভাব পড়েছে ১৪টি আসনেও

এই সাতটি আসনের বাইরেও বরিশালের বাকি ১৪টি নির্বাচনি এলাকায় ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতের প্রভাব পড়েছে তলানিতে। ভোটারদের প্রত্যাশা ছিল একযোগে লড়লে তারা বিএনপির সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। এখন সেই সম্ভাবনাও শেষ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী আন্দোলনের জোট ত্যাগ এবং জামায়াতের একক প্রার্থিতার কারণে পুরো বরিশাল বিভাগে বিএনপি বিনা প্রতিরোধে এগিয়ে যাচ্ছে। একদিকে আওয়ামী লীগের ভাঙন ও বিএনপির পুনর্গঠিত ঘাঁটি, অন্যদিকে ইসলামি দলগুলোর ছন্নছাড়া অবস্থান—সব মিলে বরিশালে এখন বিএনপির ‘স্বস্তির জয়’ সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *