টানাপড়েন কেটেছে, সব আসনে জয়ের লক্ষ্যে এখন একাট্টা সিলেট বিএনপি

মনোনয়ন বিতরণ ঘিরে বেশ কিছুদিন ধরে সিলেট জেলা বিএনপি-তে চলা বিদ্রোহ ও অভ্যন্তরীণ সংকট এখন অনেকটাই পেছনে ফেলে এসেছে দলটি। রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রতীক বরাদ্দের পর বিএনপির সিলেট অঞ্চলে এক ধরনের ঐক্যের আবহ তৈরি হয়েছে। এর বড় প্রমাণ বৃহস্পতিবার (২১ জানুয়ারি) সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত বিএনপির বিশাল জনসমাবেশ, যা সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে দলের সবচেয়ে বড় জমায়েত বলেই মনে করছেন নেতাকর্মীরা।

দলীয় মনোনয়ন নিয়ে শুরুর দিকে সিলেট-১, ৩, ৪ ও ৬ আসনে ছিলো নানা ধরনের টানাপড়েন, জল্পনা ও বিদ্রোহের শঙ্কা।

সিলেট-১ আসন: এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন সাবেক মেয়র ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী এবং আরেক উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। মুক্তাদিরকে মনোনয়ন দিলে আরিফ বিদ্রোহ করতে পারেন—এমন আলোচনায় সরব ছিল দলীয় মহল। শেষপর্যন্ত মুক্তাদিরকে বাদ দিয়ে আরিফুল হক চৌধুরীকে পাঠানো হয় সিলেট-৪ আসনে। ফলে সংকটের অবসান ঘটে।

সিলেট-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনা। এই আসনে প্রথমে তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ূনের নাম সামনে এলেও শেষ পর্যন্ত নেতা-কমীদের দাবিকে সম্মান জানিয়ে লুনাকে মনোনয়ন দিলে এখানে একাট্টা হয়ে মাঠে নাম বিএনপি।

সিলেট-৩ আসন: এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন এমএ মালিক, ব্যারিস্টার এমএ সালাম এবং আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। শেষ দিন দেখা গেল, সালাম ও কাইয়ুম মালিকের পাশে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে এই আসনেও বিদ্রোহের সম্ভাবনা নিস্তেজ হয়ে যায়।

সিলেট-৪ আসন: আরিফুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ায় মনঃক্ষুণ্ণ হন বিএনপি নেতা আব্দুল হাকিম চৌধুরী। বিদ্রোহের আভাসও ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর ‘আরিফ ম্যাজিক’ কাজ করে, হাকিম চৌধুরী সরে দাঁড়ান এবং আরিফকে সমর্থন জানান।

ব্যতিক্রম সিলেট-৫ আসন: এখানেই এখনও কিছুটা অস্বস্তি রয়ে গেছে বিএনপির জন্য। কারণ, বহিষ্কৃত নেতা ও জেলা বিএনপির প্রথম সহসভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন) বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়ে গেছেন নির্বাচনে। যদিও এ আসনে বিএনপি নিজস্ব প্রার্থী না দিয়ে জোটের অংশ হিসেবে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে সমর্থন দিচ্ছে। তারেক রাহমানের নির্বাচনী শোডাউনের পর এখানেও আর কোনো সমস্যা থাকবে না বলেই মনে করছেন নেতা-কর্মীরা।

সিলেট-৬ আসন: দলের সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী মনোনয়ন পেলেও, ২০১৮ সালের প্রার্থী ফয়সল আহমদ চৌধুরী ছিলেন পুনরায় মনোনয়নের প্রত্যাশী। তার পক্ষ থেকে আপত্তিও আসে। বিএনপি কেন্দ্র থেকে তাকে মনোনয়নপত্র জমা দিতেও বলা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত দলের সিদ্ধান্ত হয় এমরান চৌধুরীর পক্ষেই। বিষয়টি নিয়ে আবারও বিদ্রোহের ইঙ্গিত মিললেও ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর এমরানের ডাকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ফয়সল নিজেই উপস্থিত হন এবং ঐক্যের ডাক দেন। তার আহ্বান—সব নেতাকর্মী যেন দলীয় প্রার্থীর জন্য কাজ করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকদের মতে, সিলেট বিএনপি একসময় যে বিভক্তির পথে হাঁটছিল, তা এখন অনেকটাই একসূত্রে বাঁধা পড়েছে। জনসভার বিপুল উপস্থিতি, বিদ্রোহীদের প্রকাশ্যে সমর্থন এবং একে অপরের পাশে থাকার বার্তা দলীয় ঐক্যেরই বড় ইঙ্গিত।

সবমিলিয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে বলা চলে, সিলেট বিএনপি এখন প্রায় পুরোপুরি একাট্টা—ধানের শীষের পক্ষে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *