গতকাল নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার মাঝপথ থেকেই যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party – BNP)-এর ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-কে ঘিরে তৈরি করা হাইপের বেলুন ধীরে ধীরে চুপসে যেতে শুরু করে, তখনই দৃশ্যপটে আসে নতুন এক বয়ান। এক শ্রেণির জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবী সামনে আনেন নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব। ভোটের ব্যবধান নিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন পরিসংখ্যান, যার কেন্দ্রে ছিল একটি বড় দাবি—”৫ হাজারের কম ভোটে হারানো আসনের সংখ্যা নাকি ৫৩টি, আর সেই আসনগুলোতেই কারচুপির মাধ্যমে জামায়াত জোটকে বঞ্চিত করা হয়েছে।” এমনকি জামায়াতের পক্ষে টকশো ও সেমিনারে অংশ নেওয়া কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকেও সামাজিক যোগাযেগ মাধ্যমে এমন বিকৃত তথ্য উপাত্ত নিয়ে পোস্ট দিতেও দেখা যায়।
কিন্তু ঘোষিত ফলাফলের বিশ্লেষণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
জাতীয় সংসদের ২৯৭টি আসনের চূড়ান্ত ফল খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, ৫ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে মোট ২২টি আসনে। এই ২২টি আসনের মধ্যে সর্বনিম্ন ব্যবধান ৩৮৫ ভোট এবং সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৭০২ ভোট। অর্থাৎ ৫ হাজারের নিচে ব্যবধান থাকা আসনের হার মোট আসনের প্রায় ৭.৪ শতাংশ (২২/২৯৭)—যা জামায়াতের বটবাহিনী বা জামায়াতের সেই সব বুদ্ধিজীবীর দাবিকৃত ৫৩ আসনের দাবির সঙ্গে স্পষ্টতই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই ২২টি আসনের ফল জোটভিত্তিকভাবে বিশ্লেষণ করলে তাদের এই মিথ্যা বয়ানের চিএ আরো বেশি পরিষ্কার হয়ে যায়। “৫ হাজারের কম ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত” হওয়া এই ২২ টি আসনের মধ্যে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জয় পেয়েছে ১১টি আসনে— অর্থাৎ ঠিক ৫০% আসনে তারাই জয় পেয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্রদের দখলে গেছে ৯টি আসন, যা প্রায় ৪০.৯%। আর বাকি দুটি আসনের মধ্যে একটি স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং অন্যটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (Islami Andolon Bangladesh) পেয়েছে। সম্মিলিতভাবে এদের অংশ প্রায় ৯.১%।
সবচেয়ে কম ব্যবধানের পাঁচটি আসনের দিকে তাকালে বাস্তবতা ও প্রচারিত দাবির ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। মাদারীপুর-১ আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান মাত্র ৩৮৫ ভোট, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে ৫৯৪ ভোট—এই দুই আসনেই বিজয়ী হয়েছেন জামায়াত বা তাদের মিত্র প্রার্থী। বিপরীতে কক্সবাজার-৪ আসনে ব্যবধান ৯২৯ ভোট, চট্টগ্রাম-১৪ আসনে ১ হাজার ২৬ ভোট এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনে ১ হাজার ৬১ ভোট—এই তিনটিতেই জয় পেয়েছেন বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা। অর্থাৎ সবচেয়ে কম ব্যবধানের শীর্ষ পাঁচ আসনের মধ্যে দুইটি গেছে জামায়াত-মিত্রদের ঝুলিতে, তিনটি বিএনপি-মিত্রদের দখলে।
ভোটের ব্যবধান ছোট থেকে বড় ক্রমে সাজিয়ে সবচেয়ে কম ব্যবধানের ৫০টি আসনের হিসাব করলেও তাদের সেই দাবির অসারতা আরো ভালোভাবে ফুটে ওঠে। এই ৫০টি আসনে ব্যবধানের পরিসর ৩৮৫ ভোট থেকে ৯ হাজার ৫৮১ ভোট পর্যন্ত। মোট আসনের প্রায় ১৬.৮ শতাংশ (৫০/২৯৭) ।
আসন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ৫০টি আসনের মধ্যে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা জয় পেয়েছে ২৪টিতে, যা এই ৫০ আসনের ৪৮%। আর অন্যদিকে বিএনপি ও তাদের মিত্ররা জিতেছে ২২টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৪৪%। তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং একটি আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জয়ী হয়েছে—মোট ৪টি আসন, যা এই ৫০ আসনের ৮%। অর্থাৎ কম ব্যবধানের আসনগুলোর হিসাবেও জামায়াতের পাল্লা একেবারে হালকা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের সমর্থন পুষ্ট জামায়াতের পাল্লাটাই ভারী।
সংখ্যার নিরিখে দেখা যায়, সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ২২টি আসনে জামায়াত-মিত্রদের সাফল্যের হার বিএনপি-মিত্রদের তুলনায় বেশি। আবার ৫০টি নিকট ব্যবধানের আসনে দুই জোটের প্রাপ্ত আসনের ব্যবধানও খুব বড় নয়—মাত্র দুইটি আসন হলেও জামাতের মোট আসনের তুলনায় তা অনেকটাই বেশি। জামায়াত আর তার জোটের মোট জয় পাওয়া আসনের ৩১% আসনের ক্ষত্রেই এই ব্যবধান ৫ হাজার ভোটের নিচে। আর অন্য দিকে বিএনপি জোটের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ১০%।
ফলে ৫৩টি আসনে পরিকল্পিত কারচুপির যে বড় দাবি তোলা হয়েছে, ঘোষিত ফলাফলের বিশ্লেষণ তার পক্ষে তো কোনো স্পষ্ট প্রমাণ তো হাজিরই করে না; বরং বরাবরের মতো তাদের মিথ্যাচারের চিত্রই আবার নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
ডাটা সূত্র: ডিসমিসল্যাব


