এই নির্বাচন সংবিধানে ছিল? তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংবিধানে খুঁজেন কেন- প্রশ্ন শিশির মনিরের

সংবিধানের আলোকে বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন প্রশ্নে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি শিশির মনির (Shishir Monir)। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দেন—“গণঅভ্যুথান সংবিধানে ছিল? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধানে ছিল? এই নির্বাচন সংবিধানে ছিল? গণভোট সংবিধানে ছিল? তাহলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ/শপথ সংবিধানে খুঁজেন কেন? উত্তর আছে?”

তার এই বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। শিশির মনিরের প্রশ্নে মূলত ইঙ্গিত করা হয়েছে—যে সব রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তন অতীতে ঘটেছে, সেগুলোর অনেকগুলোই সরাসরি সংবিধানে উল্লেখ ছিল না; তাহলে এখন কেন ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সংবিধানের দোহাই দেওয়া হচ্ছে?

একই বক্তব্য নিজের ফেসবুকেও শেয়ার করেছেন মো. সারজিস আলম (Mo. Sarjis Alam), যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizens Party)-এর মুখ্য সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল)। তবে তিনি কমেন্টে শিশির মনিরকে কৃতিত্ব দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১১ দলীয় জোটের সদস্যরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party) জোটের সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এই ভিন্ন অবস্থান থেকেই মূলত বিতর্কের সূত্রপাত। কেউ এটিকে সাংবিধানিক শুদ্ধতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ দেখছেন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে।

তবে এই বিতর্কের বিপরীতে একটি শক্তিশালী পাল্টা যুক্তিও সামনে এসেছে। গত দেড় বছর ধরে একটি পপুলিস্ট যুক্তি বারবার উচ্চারিত হচ্ছে—বর্তমান ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা। কিন্তু বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।

তাদের মতে, লীগ সরকারের পলায়নের পর যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, সেটি কার্যত একটি সাংবিধানিক সরকার। সংসদ অনুপস্থিত থাকায় সংবিধানের বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। সংবিধান বাতিল বা স্থগিত করা হয়নি—এমন কোনো ঘোষণা বা কার্যক্রমও দেখা যায়নি। ফলে সাংবিধানিক শূন্যতার অভিযোগকে তারা অতিরঞ্জিত বলেই মনে করছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যদি সত্যিই সংবিধান স্থগিত হতো বা কার্যত অকার্যকর হয়ে যেত, তাহলে বর্তমান কাঠামোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতো। কিন্তু সেই পথে কেউ হাঁটেনি। বরং সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরেই ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ঘটেছে।

এখানেই উঠে আসে শক্তির বাস্তব সমীকরণের প্রশ্ন। যারা বিপ্লবী পরিবর্তনের কথা বলেন, তাদের হাতে সেই সাংগঠনিক ও জনসমর্থনের শক্তি ছিল কি না—তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হচ্ছে। ‘বিপ্লব’ শব্দটি উচ্চারিত হলেও বাস্তবে পরিবর্তন এসেছে সাংবিধানিক ব্যবস্থার ভেতরেই—এমন পর্যবেক্ষণও রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা দেখা যায়—নিজস্ব শক্তিতে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটানোর সক্ষমতা সীমিত হলেও উচ্চকণ্ঠে বৈপ্লবিক দাবি তোলা। সমালোচকদের মতে, অনেক সময় অন্যের কাঁধে ভর করে পরিবর্তনের ডাক দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তব দায়িত্ব গ্রহণের প্রশ্নে অনীহা দেখা যায়।

বিশ্লেষণে আরও বলা হচ্ছে, অতিবিপ্লবী অবস্থান ও হঠকারিতা গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে। কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার যেখানে ধৈর্য, সমঝোতা ও কাঠামোগত প্রস্তুতির দাবি রাখে, সেখানে আবেগনির্ভর স্লোগানভিত্তিক রাজনীতি অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ফলে বিতর্ক এখন কেবল ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিস্তৃত হয়েছে সংবিধানের ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বৈধতা এবং সংস্কারের পথরেখা নিয়ে মৌলিক প্রশ্নে। গণতান্ত্রিক সংস্কার কি বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে এগোবে, নাকি স্লোগানের ভিড়ে আবারও থমকে যাবে—এই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক পরিসরে ঘুরপাক খাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *