নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে সুসংহত মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ ‘নাগরিক প্ল্যাটফর্ম’-এর

নতুন সরকারকে নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে একটি সুসংহত মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে ‘নাগরিক প্ল্যাটফর্ম’। তাদের মতে, আবেগ বা উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়—রাষ্ট্র পরিচালনায় এখন প্রয়োজন বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক রূপরেখা।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘ম্যাক্রোইকোনোমিক বেঞ্চমার্ক ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ পরামর্শ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে আয়োজক হিসেবে ছিল নাগরিক প্ল্যাটফর্ম (Citizens’ Platform)। এতে বক্তব্য দেন তৌফিকুল ইসলাম খান (Towfiqul Islam Khan), যিনি সিপিডি (Centre for Policy Dialogue)-এর অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক। উপস্থিত ছিলেন সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য (Debapriya Bhattacharya) ও মোস্তাফিজুর রহমান (Mustafizur Rahman)।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আসন্ন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবসম্মত জাতীয় বাজেট কাঠামো প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে। পাশাপাশি অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতে ব্যয় পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তার সতর্কবার্তা—বিদ্যমান বাজেটকে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সংশোধন করা না হলে আর্থিক ভারসাম্য রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

ব্রিফিংয়ে সিপিডি একটি বহুপক্ষীয় (মাল্টি-স্টেকহোল্ডার) উন্নয়ন ফোরাম গঠনের সুপারিশ করে। এ ফোরামে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। তাদের বক্তব্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কাঠামোবদ্ধ সংলাপ ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়। নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পক্ষের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সংস্কারের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা—দুই-ই বাড়বে।

অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের ওপরও জোর দেন বক্তারা। এ রোডম্যাপে নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং পরিমাপযোগ্য সূচক অন্তর্ভুক্ত থাকা জরুরি বলে তারা মত দেন। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর কৌশল দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়। বক্তাদের মতে, বাণিজ্য সুবিধা হ্রাস, শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে আগাম প্রস্তুতি না নিলে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

সিপিডির পর্যবেক্ষণ—নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্ত নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক ও সক্ষমতানির্ভর পরিকল্পনা। এজন্য একটি সুসংহত মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তার সঙ্গে বাজেট ও সংস্কার কর্মসূচির কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হবে। বক্তারা বলেন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়; তা অর্জনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিশ্চিত না করা গেলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি হবে।

সিপিডি মনে করে, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে নতুন সরকারের পক্ষে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। তাদের এই সুপারিশগুলো মূলত একটি কাঠামোবদ্ধ, বাস্তবমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পক্ষে স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *