‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের পথে সরকার: কারা পাচ্ছেন, কারা থাকছেন বাইরে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)–বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম আলোচিত প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠনের পর এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা। সরকার জানিয়েছে, আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে প্রান্তিক মানুষের হাতে এই কার্ড তুলে দিতে জোর প্রস্তুতি চলছে।

প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা করে সহায়তা দিলে এক অর্থবছরে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ১২ হাজার ৭২ কোটি টাকা (ক্যাশ-আউট চার্জসহ)। এই কর্মসূচির সম্ভাব্য বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণে রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) অর্থ মন্ত্রণালয় (Ministry of Finance Bangladesh)-এ অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Ameer Khasru Mahmud Chowdhury)-এর সভাপতিত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে কর্মসূচির আর্থিক কাঠামো, উপকারভোগী নির্বাচন এবং বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৫০ লাখ পরিবারকে মাসিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করে এবং দ্বৈত সুবিধা বন্ধের মাধ্যমে প্রায় ৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। সে হিসেবে নিট অর্থের প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৬ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা।

বর্তমানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (Trading Corporation of Bangladesh)-এর ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় প্রায় ৬৫ লাখ পরিবার ভর্তুকিমূল্যে পণ্য পাচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্য মন্ত্রণালয় (Ministry of Food Bangladesh)-এর খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় (Ministry of Women and Children Affairs)-এর ভালনারেবল ওম্যান ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচিসহ একাধিক প্রকল্পের তথ্য একীভূত করে নতুন ফ্যামিলি কার্ডে অন্তর্ভুক্তির পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য একটাই—এক ছাতার নিচে প্রকৃত প্রান্তিকদের নিয়ে আসা, কিন্তু যেন দ্বৈততা না থাকে।

যারা পাবেন

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড পেতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিল বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সুপারিশ আসতে হবে।

গ্রামের সবচেয়ে হতদরিদ্র পরিবার, নিম্ন আয়ের মানুষ, উপার্জনে অক্ষম সদস্যবিশিষ্ট পরিবার, নারীপ্রধান ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার অগ্রাধিকার পাবে। বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, স্বামী পরিত্যক্তা বা অসচ্ছল নারীপ্রধান পরিবার, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী অবিবাহিত মেয়ের পরিবার, প্রত্যাগত অভিবাসী—বিশেষত নারী অভিবাসীর পরিবার, এবং শিশু, প্রতিবন্ধী বা অটিজম আক্রান্ত সদস্য থাকা পরিবারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। বিদ্যমান কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগীরা একযোগে এ সুবিধা পাবেন না—এমন বিধিনিষেধও রাখা হচ্ছে।

যেসব পরিবারের ঘরের দেওয়াল মাটি, পাটকাঠি বা বাঁশ দিয়ে তৈরি, ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুর পরিবার—তাদের অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হবে। ভূমিহীন পরিবার বলতে বোঝানো হয়েছে—যাদের বসতভিটা ও কৃষিজমি নেই কিন্তু কৃষিনির্ভর; অথবা যাদের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বসতভিটা আছে কিন্তু কৃষিযোগ্য জমি নেই—তাদেরও ভূমিহীন হিসেবে গণ্য করা হবে।

যারা পাবেন না

একই পরিবারের একাধিক সদস্য তালিকাভুক্ত হতে পারবেন না। যেসব পরিবার ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পাচ্ছেন এবং নতুন সমন্বিত কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হবেন না, তারাও ফ্যামিলি কার্ডের বাইরে থাকবেন।

সরকারি তালিকাভুক্ত উপকারভোগীদের তথ্য ‘সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’-এ যাচাই করে যদি দ্বৈততা পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও এই কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।

আবেদন করতে যা লাগবে

অর্থবিভাগের সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) ব্যবহার করে পাইলট প্রকল্প চালুর প্রস্তাব রয়েছে। নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজন হবে—এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ, মোবাইল ফোন নম্বর এবং ইউনিয়নের নাম।

বর্তমানে ‘সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেম’-এ ৪ কোটির বেশি উপকারভোগীর তথ্য সংরক্ষিত আছে। এনআইডি, মোবাইল নম্বর বা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে দ্বৈত সুবিধা রোধের ব্যবস্থা রাখা হবে। সরকার বলছে, লক্ষ্য শুধু সহায়তা দেওয়া নয়—বরং সঠিক মানুষকে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *