টানা ১৮ মাস দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩২টি অধ্যাদেশের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত আইনে পরিণত হচ্ছে না। নিজেদের সংস্কারনীতি ও নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিবেচনায় যেসব অধ্যাদেশ রয়েছে, সেগুলো থেকে সরে আসার কৌশল নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)। দলটির শীর্ষ পর্যায়ের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়া ও নানা সিদ্ধান্তের সঙ্গে তারা শুরু থেকেই পূর্ণ একমত ছিল না। তবে রাষ্ট্রের গুণগত সংস্কার এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জারি করা অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে অর্ধশতাধিক হয়তো শেষ পর্যন্ত আইনে রূপ পেতে পারে। বাকিগুলো কার্যত বাতিল হয়ে যাবে। নির্বাচন ব্যবস্থা থেকে বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা থেকে ফৌজদারি অপরাধ, দুর্নীতি দমন ও অর্থ পাচার, জনপ্রশাসন ও শৃঙ্খলা, স্থানীয় সরকার, অর্থনীতি, রাজস্ব ও কর কাঠামো, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও সুশাসন—বিস্তৃত ক্ষেত্র জুড়ে এসব অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন (Election Commission) ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে আনা কিছু অধ্যাদেশ রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোনো অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার আগে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পর্যালোচনা হবে। বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতায় সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সেটিই হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। প্রথমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী তার মতামত দেবেন। প্রয়োজনীয় মনে হলে খসড়া মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করা হবে। সেখানে অনুমোদন পেলে তা আইনে রূপান্তরের জন্য জাতীয় সংসদ (Jatiya Sangsad)-এ উপস্থাপন করা হবে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির জারি করা অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার ৩০ দিনের মধ্যে আইনে রূপান্তর করতে হয়। তা না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (Awami League) সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। ওই বছরের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৪ সালে ১৭টি, ২০২৫ সালে ৮০টি এবং ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত আরও ৩৫টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। মোট ৫৫৯ দিনের দায়িত্বকালে অন্তর্বর্তী সরকার ১৩২টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে।
এর আগে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার (1/11 Caretaker Government) বিভিন্ন খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে ১২২টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে গঠিত নবম সংসদে ওই সব অধ্যাদেশ একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। পরে সেগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ৫৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের সুপারিশ করে এবং সেগুলো পরবর্তীতে আইন হিসেবে পাস হয়। বাকি অধ্যাদেশগুলো সংসদের অনুমোদন না পাওয়ায় অধিবেশন শুরুর ৩০ দিনের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশ মূলত আইনেরই একটি রূপ, যা সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জারি করতে পারেন। জাতীয় সংসদ ভেঙে গেলে বা অধিবেশন না থাকলে এবং জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে রাষ্ট্রপতি এই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরবর্তী সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই তা উত্থাপন করতে হয়। এখন প্রশ্ন উঠেছে—১৩২ অধ্যাদেশের মধ্যে কতগুলো টিকে থাকবে, আর কতগুলো ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।


