তড়িঘড়ি করে মাঠ পর্যায়ের মতামত না নিয়েই পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে বাহিনীর ভেতরে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন (Bangladesh Police Association)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্যও আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে অ্যাসোসিয়েশন জানায়, গভীর দায়িত্ববোধ ও পেশাগত অঙ্গীকারের জায়গা থেকে তারা বাংলাদেশ পুলিশের ইউনিফর্ম পরিবর্তনের বিষয়ে নিজেদের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরছে। অধস্তন সদস্যদের উপলব্ধি, মাঠ পর্যায়ে সংগৃহীত মতামত, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি মনে করছে—বর্তমান ইউনিফর্ম প্রত্যাশিত গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের ভাষায়, বিষয়টি এখনই পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশের পোশাক কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পরিধান নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব, জনআস্থা, নিরাপত্তা ও পেশাগত মর্যাদার প্রতীক। দীর্ঘদিন ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্মটি জনগণের কাছে আস্থা ও নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। পরিচিত রং, স্বতন্ত্র নকশা এবং উচ্চ দৃশ্যমানতা পুলিশের তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নতুন ইউনিফর্মে সেই স্বাতন্ত্র্য ও ধারাবাহিকতা বজায় নেই—এমন মতামতই উঠে এসেছে বহু সদস্য ও নাগরিকের প্রতিক্রিয়ায়।
প্রায় সোয়া দুই লক্ষাধিক অধস্তন সদস্যের এই সংগঠনটির দাবি, মাঠপর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে বর্তমান পোশাকের কাপড়ের গুণগত মান, আরামদায়কতা, আবহাওয়াগত উপযোগিতা এবং দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনে স্বাচ্ছন্দ্যের ক্ষেত্রে নানা নেতিবাচক দিক রয়েছে। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া, দায়িত্ব পালনের প্রকৃতি এবং দিন-রাতে দৃশ্যমানতার বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘দ্রুত ও স্পষ্ট শনাক্তযোগ্যতা’ বা ভিজিবিলিটির প্রশ্নে। অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্যমতে, নতুন পোশাক তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান হওয়ায় দূর থেকে পুলিশ সদস্যদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণ জননিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এমন বাস্তবতাকে সামনে রেখেই তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
এছাড়া নতুন ইউনিফর্মের রং ও নকশা বিভিন্ন বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় বিভ্রান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এতে পুলিশের স্বতন্ত্র মর্যাদা ও তাৎক্ষণিক পরিচিতি ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা একটি রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য মোটেই কাম্য নয়।
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ সদস্যরা ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষতা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাঁদের ভূমিকা দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়। অ্যাসোসিয়েশনের মতে, শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে পুলিশের অবদান পূর্বের ইউনিফর্মের কার্যকারিতা, গ্রহণযোগ্যতা ও বাস্তবসম্মত উপযোগিতার প্রমাণ বহন করে।
সংগঠনটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, ইউনিফর্ম পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অধস্তন সদস্যদের অভিজ্ঞতা, আবেগ, পেশাগত বাস্তবতা এবং ঐতিহ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া আবশ্যক। হঠাৎ পরিবর্তনের ফলে সদস্যদের আত্মমর্যাদা, গর্ব এবং পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে জড়িত ঐতিহ্যগত সংযোগে ব্যাঘাত ঘটেছে—যা বাহিনীর ভেতরে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
অতএব, বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন সরকারের প্রতি বিনীত কিন্তু দৃঢ় আহ্বান জানিয়েছে—পুলিশ সদস্যদের মতামত, মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং জনমতের আলোকে ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। পুলিশের মর্যাদা, পেশাদারিত্ব ও জনআস্থা রক্ষার্থে পূর্বের অধিক গ্রহণযোগ্য, দৃশ্যমান ও স্বতন্ত্র ইউনিফর্ম পুনর্বহালের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।


