দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের প্রশ্নে ‘কঠোর’ অবস্থানেই রয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড। নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু সাতজন বিজয়ী নন—বিদ্রোহী প্রার্থীরা অন্তত ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিয়েছেন। এর মধ্যে ২১টি নিশ্চিত আসন হাতছাড়া হয়েছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে। ফলে নির্বাচনের পর দলীয় ভেতরে যেমন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে, তেমনি কৌশলগত ভবিষ্যৎ নিয়েও চলছে ভাবনা।
এবারের নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে সাতজন স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হয়েছেন। পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা জিতেছেন ২১টি আসনে। সবমিলিয়ে ২৮টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব ছিল সুস্পষ্ট—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জয়ী সাতজনের ভবিষ্যৎ কী?
বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে জয়ী হওয়া সাতজনের অধিকাংশই ইতোমধ্যে দলে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, দল চাইলে তারা ফিরে আসতে প্রস্তুত এবং নিজেদের এখনও বিএনপিরই অংশ হিসেবে দেখেন।
তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান স্পষ্টভাবে বলেছেন, দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। তাদের পুনর্বহাল করা হবে কি না—এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
দলীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। সংসদের সংখ্যাগত হিসাব, সরকারবিরোধী রাজনৈতিক কৌশল এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্থায়ী কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্নে চেয়ারম্যান এবার অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। ফলে যারা নির্দেশ অমান্য করেছেন, তাদের দ্রুত দলে ফেরার সম্ভাবনা কম।
২৮ আসনে বিদ্রোহীর থাবা, লাভবান জামায়াত জোট
নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল ৭৮টি আসনে। এর মধ্যে সাতজন জয়ী হলেও বাকিদের কারণে ভোট ভাগাভাগিতে কপাল পুড়েছে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের আর সেই সাথে বিপাকে পড়েছে জোট শরিক দলের নেতারা। অন্তত ২১টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা ভোট কাটায় জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর প্রথমদিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ১১৭টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন অন্তত ১৯০ জন বিএনপি নেতা। পরে দলীয় নির্দেশনা মেনে বেশিরভাগই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। কিন্তু কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়াইয়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ৭৮টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা থেকে যান। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে তাদের বহিষ্কার করে বিএনপি। এমনকি তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় সারা দেশে সহস্রাধিক নেতাকর্মীকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সেই ৭৮টি আসনের মধ্যে ২১টিতে জয়ী হন জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা, আর বিএনপির বিদ্রোহীরা জেতেন সাতটিতে। সব মিলিয়ে ২৮টি আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধানে সরাসরি প্রভাব ফেলেছেন বিদ্রোহীরা। অনেকেই ভেবেছিলেন, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই যথেষ্ট হবে। কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল দেখিয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা—সাতজন ছাড়া অধিকাংশই বড় ব্যবধানে হেরেছেন।
নির্বাচনী ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে বিএনপি অন্তত ২১টি আসনে ধরাশায়ী হয়েছে।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি সমর্থিত বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক পান ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। বিএনপির বিদ্রোহী সাইফুল আলম (নীরব) পান ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। সম্মিলিত ভোট ৬০ হাজার ৮৩২। কিন্তু ভোট বিভক্ত হওয়ায় ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন জামায়াত প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন।
সিলেট-৫ আসনে বিএনপি সমর্থিত জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি উবায়দুল্লাহ ফারুক পান ৬৯ হাজার ৭৭৪ ভোট। বিদ্রোহী মামুনুর রশিদ পান ৫৬ হাজার ৩৬৯ ভোট। কিন্তু ৭৯ হাজার ৩৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমী পান ৮০ হাজার ৬১৯ ভোট। বিদ্রোহী মো. শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন পান যথাক্রমে ৩৯ হাজার ৫৮৯ ও ৪ হাজার ৭৭৯ ভোট। ভোট ভাগাভাগির সুযোগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল্লাহ আল আমিন ১ লাখ ৬ হাজার ১৭১ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
একইভাবে চট্টগ্রাম-১৬, পাবনা-৪, বাগেরহাট-১, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২, যশোর-৫, মাদারীপুর-১, ঢাকা-১৪, সাতক্ষীরা-৩, ময়মনসিংহ-৬, পাবনা-৩, শেরপুর-১, গাইবান্ধা-৫, বাগেরহাট-২ ও বাগেরহাট-৪ আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
পরাজিতদের ‘ঘরে ফেরার’ আকুতি
নির্বাচনে ভরাডুবির পর মোহভঙ্গ হয়েছে অধিকাংশ বিদ্রোহী প্রার্থীর। দলীয় প্রতীকের বাইরে ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক যে নড়বড়ে—তা ফলেই প্রমাণিত। এখন অনেকেই ভুল স্বীকার করে দলে ফিরতে চাইছেন।
ঢাকা-১৪ আসনে পরাজিত বহিষ্কৃত নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (সাজু) বলেন, ‘আজীবন বিএনপির রাজনীতি করেছি। দল যদি পুনর্বিবেচনা করে, দলের জন্যই কাজ করব।’
নাটোর-১ আসনে পরাজিত তাইফুল ইসলাম টিপুও একই সুরে বলেন, ‘আদর্শিক জায়গা থেকে আমি বিএনপিতেই আছি। দল চাইলে কর্মী হিসেবেই কাজ করে যাব।’
হাইকমান্ডের বার্তা: দল আগে, ব্যক্তি পরে
দল পুনর্গঠনের কাজ সামনে—এমনটাই বলছেন শীর্ষ নেতারা। তার আগে বহিষ্কৃতদের বিষয়ে নমনীয়তা দেখানোর সুযোগ নেই বলেই ইঙ্গিত মিলছে। নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম তারা যেন দলের সিদ্ধান্তের বাইরে না যান। কিন্তু তারা কথা রাখেননি। এখন ফিরতে চাচ্ছেন ভালো, তবে দেখা যাক কী করা যায়।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন পাওয়ায় দলের অবস্থান যথেষ্ট শক্তিশালী এস তাই বিদ্রোহী হয়ে জয়ী হওয়া সাত এমপিকে এখনই দলে ফেরানোর তাড়া দেখাচ্ছে না বিএনপি। তারা ধারণা করছেন, আপাতত তাদের দলীয় কাঠামোর বাইরে রেখেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে হাইকমান্ড।
বিশেষ করে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তৃণমূল পর্যায়ে কোনো বিভ্রান্তিকর বা ‘নরম অবস্থান’–এর বার্তা দিতে চায় না দল। দলীয় শৃঙ্খলা প্রশ্নে কঠোর অবস্থান দেখানোই এখন অগ্রাধিকার।
এদিকে যারা বিদ্রোহী হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রেও দ্রুত কোনো ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত নেই। দলীয় মহলে স্পষ্ট বার্তা—শৃঙ্খলা ভঙ্গের পরিণতি আছে, এবং তা সহজে উপেক্ষা করা হবে না।


