অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া (Asif Mahmud Sajeeb Bhuiyan)–কে ঘিরে নানা সময় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (National Citizen Party – NCP)-এর মুখপাত্র হিসেবে সক্রিয় এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব উপদেষ্টার পদ ছাড়ার পর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থিতার ঘোষণা দিলে সমালোচনার মাত্রা আরও বাড়ে।
এই প্রেক্ষাপটেই নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব দিতে সরাসরি ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করেন তিনি। আর সেই ঘটনাকে ঘিরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনার জন্ম দেন হাসনাত আবদুল্লাহ (Hasnat Abdullah), কুমিল্লা-৪ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ও এনসিপির মুখ্য সংগঠক।
বুধবার (৪ মার্চ) রাত ৯টা ২২ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে হাসনাত লিখেছেন, “আজ তলব করা হয়েছিল শুধু আসিফ মাহমুদকে। আসিফ মাহমুদ তার পরিবারের ৪ জনের মোট ৯টি অ্যাকাউন্টের ব্যাংক স্টেটমেন্ট আজ প্রকাশ করেছেন। আসিফ মাহমুদদের সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই ‘সেফ এক্সিট’ নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ তারা আইনানুযায়ী সকল বিধি মেনে নিজের ও পরিবারের সবার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট প্রকাশ করছেন। মিথ্যা, অপপ্রচার, এত-শত মিডিয়া ট্রায়াল—উৎপাদিত দুর্নীতির অভিযোগ দিনশেষে স্রেফ অভিযোগ হিসেবেই থাকবে। প্রমাণিত আর হবে না।”
স্ট্যাটাসটি প্রকাশের পর মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে পড়ে। মাত্র ১২ মিনিটের ব্যবধানে বিপুল সাড়া মেলে। এক ঘণ্টার মধ্যেই দেড় লাখের বেশি রিয়েকশন জমা পড়ে পোস্টটিতে। পাশাপাশি হাজারের বেশি মন্তব্য এবং প্রায় আড়াই হাজার আইডি থেকে শেয়ার হওয়ার তথ্যও পাওয়া যায়। রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান বিতর্ক যেন এক ঝটকায় সামাজিক মাধ্যমে নতুন গতি পায়।
এর আগে বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জনসম্মুখে তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ। সেখানে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের সময় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে আয় ও সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী জমা দিয়েছেন। তবুও যেহেতু বিষয়টি নিয়ে জল্পনা অব্যাহত ছিল, তাই তিনি মনে করেছেন জনগণের সামনে সব হিসাব উন্মুক্ত করাই সবচেয়ে স্বচ্ছ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, “গতকাল আমি শুধু আমার ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করার কথা জানিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেই, আমারসহ পরিবারের সবার ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করব, যাতে কোনো প্রশ্ন অবশিষ্ট না থাকে।”
সংবাদ সম্মেলনে পারিবারিক হিসাবের বিস্তারিত তুলে ধরেন এনসিপির এই মুখপাত্র। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাবার পাঁচটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে মোট জমা রয়েছে ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৭১১ টাকা। তবে শিক্ষক হিসেবে নেওয়া ১০ লাখ টাকার সার্ভিস লোনের বিপরীতে এখনো ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৬ টাকা পরিশোধ বাকি আছে। ফলে প্রকৃত হিসাবে তিনি প্রায় ৮২ হাজার ৩৫ টাকার দেনায় আছেন।
তার মায়ের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রয়েছে ২১ হাজার ১৫৪ টাকা। স্ত্রীর একমাত্র অ্যাকাউন্টে রয়েছে ৬১৩ টাকা।
নিজের ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদ জানান, তার দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এর একটি সোনালি ব্যাংক (Sonali Bank)-এর সেভিংস অ্যাকাউন্ট, যেখানে জমা আছে ৯ হাজার ৯৩০ টাকা। অন্যটি তার সেলারি অ্যাকাউন্ট, যার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকা অবস্থায় বেতন, যাতায়াত ভাতা ও অন্যান্য সরকারি লেনদেন সম্পন্ন হতো।
তিনি জানান, ১৬ মাস দায়িত্ব পালনকালে গড়ে মাসিক ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বেতন হিসেবে পেয়েছেন। বর্তমানে সেলারি অ্যাকাউন্টে জমা আছে ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৬২৬ টাকা। সবমিলিয়ে এই অ্যাকাউন্টে মোট ক্রেডিট হয়েছে ৮৫ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং ডেবিট হয়েছে ৭৬ লাখ ৩ হাজার টাকা। তার দুই অ্যাকাউন্টে সম্মিলিত বর্তমান স্থিতি ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৫৫৬ টাকা।
ব্যাংক হিসাব প্রকাশের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক বিতর্ক থামাবে, নাকি নতুন করে প্রশ্ন উত্থাপন করবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।


