জনস্বাস্থ্যকে পাশ কাটিয়ে কোনো দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়—এই বাস্তবতা তুলে ধরে অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে দ্রুত আইনে রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত (Dr. M A Muhith)।
রবিবার (৮ মার্চ) রাজধানীর সিরডাপ আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর (Tahsina Rushdir), বিশ্বস্বাস্থ্য অণুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর (Directorate General of Health Services)-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization)-এর টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ বলছে—বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রায় ২ কোটি ১৩ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহার করে। প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় ২ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫৪৬ জনের প্রাণহানির সমান। শুধু স্বাস্থ্যক্ষতি নয়, অর্থনীতিতেও এর প্রভাব মারাত্মক—তামাকের কারণে বছরে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (Ministry of Health and Family Welfare)-এর প্রস্তাবিত ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত অধ্যাদেশে ‘তামাকজাত দ্রব্য’-এর সংজ্ঞার আওতায় নিকোটিন পাউচ এবং সরকার কর্তৃক সময় সময় ঘোষিত অন্য যেকোনো নিকোটিনজাত দ্রব্য—তা যে নামেই পরিচিত হোক না কেন—অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহণে ধূমপানের পাশাপাশি সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উদীয়মান তামাক পণ্য বা ইমার্জিং টোব্যাকো প্রডাক্টসের ব্যবহার, উৎপাদন এবং বিপণনও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
একই সঙ্গে ধূমপানের জন্য নির্ধারিত স্থান রাখার বিধানকে সরকারের নির্দেশনার শর্তাধীন করা হয়েছে। ‘পাবলিক প্লেস’ ও ‘পাবলিক পরিবহণ’-এর সংজ্ঞা ও আওতাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বিক্রয়স্থলে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শন, ইন্টারনেট বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে বিজ্ঞাপন, প্রচার ও প্রসার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার বিদ্যমান ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি তামাকজনিত রোগ ও মৃত্যুহার কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই যদি এটিকে আইনে পরিণত করা না হয়, তাহলে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারাতে পারে। জনস্বাস্থ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এটিকে দ্রুত আইনে রূপান্তর করা প্রয়োজন।’
সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর বলেন, ‘তামাকের ক্ষতি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপরও গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’ তিনি টোব্যাকো এটলাস ২০২৫-এর তথ্য তুলে ধরে জানান, বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে ১১ শতাংশেরও বেশি নারী তামাকজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন। তার মতে, অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তর করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
শেখ মোমেনা মনি বলেন, ‘তামাক খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও চিকিৎসা ব্যয়, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অকাল মৃত্যুর কারণে এই খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি।’ তিনি বলেন, এই বিপুল ক্ষতি এবং প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যেই অন্তর্বর্তী সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে, যা জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের দৃঢ় অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
অধ্যাপক ডা. শাহ আলী আকবর আশরাফী বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন এটিকে আইনে রূপান্তরের দায়িত্ব নবনির্বাচিত সরকারের ওপর।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার যে দল গঠন করেছে তারা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এ বিষয়ে অঙ্গীকার করেছিল। তাই সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দ্রুত অধ্যাদেশটি পাস করে আইনে পরিণত করার দাবি জানান তিনি।
নারী মৈত্রী (Nari Maitree)-এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সভাপতি মাসুমা আলম, নারী মৈত্রী তামাকবিরোধী মায়েদের ফোরাম, শিক্ষক ফোরাম, সাংবাদিক ফোরাম, ইয়ূথ ফোরাম এবং বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
সভায় উপস্থিত প্রায় সবাই একমত পোষণ করে বলেন—জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অনুমোদিত তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই আইনে রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।


