মন্ত্রীদের অযাচিত বক্তব্য নয়, জ্বালানির বিকল্প বাজার খোঁজায় জোর দেওয়ার পরামর্শ বিশ্লেষকদের

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান (Iran) ও ইসরায়েল (Israel) সংঘাত স্বল্পমেয়াদি হোক কিংবা দীর্ঘস্থায়ী—উভয় পরিস্থিতিতেই আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব তো আছেই, পাশাপাশি দেশে চলমান জ্বালানি তেল সংকট ও বাজারে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলার পেছনে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত ও বক্তব্যও কম দায়ী নয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন সবচেয়ে জরুরি হলো জনআস্থা তৈরি করা। কিন্তু সে জায়গায় ইতিবাচক উদ্যোগের বদলে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কিছু অযাচিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশ্লেষকদের পরামর্শ, বিতর্কিত বা অপ্রয়োজনীয় বক্তব্যের পরিবর্তে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বশীলদের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও স্বচ্ছ তথ্যের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনে মনোযোগী হওয়া উচিত।

জ্বালানি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সাধারণভাবে অন্তত তিন মাসের জ্বালানি তেল মজুদ রাখাকে আদর্শ ধরা হয়। কিন্তু বাংলাদেশ (Bangladesh)-এর বর্তমান সক্ষমতা সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। দেশে এখন সর্বোচ্চ প্রায় ৪৫ দিনের জ্বালানি তেল মজুদ রাখা সম্ভব হয়, তাও আবার সম্পূর্ণভাবে আমদানি সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক অস্থিরতা শুরু হলেই সরবরাহে চাপ তৈরি হয়। ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পরপরই এর প্রভাব পড়ে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়।

খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও জানান, দেশে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও সমন্বয়ের অভাবে অপ্রয়োজনীয় সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্য বিভ্রাট ও সমন্বয়হীনতার কারণেও বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে তাদের অভিযোগ।

এদিকে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিনই বাড়ছে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও কয়লার দাম। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের গ্যাস সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে যে লোডশেডিং আরও বাড়বে এবং গ্রীষ্মকালীন চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে উঠবে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জ্বালানি তেলের মজুদ কমে যাওয়া এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া অর্থ পরিশোধে বিলম্বের কারণে তেলভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকট সামাল দিতে আপাতত বাড়তি দামে হলেও গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানি করা ছাড়া সরকারের সামনে কার্যত তেমন কোনো বিকল্প নেই। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে—সরকারকে হয় জ্বালানি খাতে ভর্তুকি আরও বাড়াতে হবে, নয়তো গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে সংকট এড়াতে এখনই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রথমত জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ের ব্যাপারে সরকারকে জোরালো প্রচারণা চালাতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করা, দেশের ভেতরে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং দ্রুত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে নতুন সরকারকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *