ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি এবং সাংগঠনিক নানা সংকটের কারণে ইতোমধ্যেই সমালোচনার মুখে রয়েছে বিএনপির প্রধান সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (Bangladesh Jatiotabadi Chhatra Dal)। একই সঙ্গে পহেলা মার্চ শেষ হয়েছে রাকিব–নাছির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ। ফলে সংগঠনটির নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা নিয়ে দলের হাইকমান্ডে শুরু হয়েছে ইতিবাচক আলোচনা।
তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মীই চাইছেন—শীর্ষ নেতৃত্ব নির্ধারণে যেন সিলেকশন পদ্ধতির পরিবর্তে কাউন্সিলের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসে। তাদের মতে, এতে সংগঠনের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চা আরও শক্তিশালী হবে।
ছাত্রদলের সর্বশেষ পাঁচটি কেন্দ্রীয় কমিটির দিকে তাকালে দেখা যায়, রাজীব–আকরাম কমিটি ছাড়া বাকি চারটি কমিটিই প্রায় দুই বছর করে দায়িত্ব পালন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব গঠনের দাবি জোরালো হয়েছে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পদকে ঘিরে সংগঠনের ভেতরে এখন চলছে নানামুখী সমীকরণ, লবিং এবং আলোচনার রাজনীতি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নতুন কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রায় ডজনখানেক নেতার নাম ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষ করে ২০০৮–০৯ থেকে ২০১১–১২ সেশনের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তৃণমূলের প্রত্যাশা—ত্যাগ, পরীক্ষিত নেতৃত্ব, বিশ্বস্ততা এবং সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।
সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় থাকা নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ২০০৮–০৯ সেশনের বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka) শাখার সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেল। ছাত্রদলের রাজনীতি করার কারণে ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (Bangladesh Chhatra League)-এর নির্যাতনের মুখে ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য হন। পরে ২০২১ সালে তার নেতৃত্বে ঢাবির নতুন কমিটি তৎকালীন উপাচার্য মো. আক্তারুজ্জামান (Md. Akhtaruzzaman)-এর সঙ্গে দেখা করতে গেলে হামলার শিকার হন এবং গুরুতর আহত হন তিনি। গ্রেফতার হওয়ার পর রিমান্ডে থেকেও তাকে কঠোর নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়েছে।
একই সেশনের আরও কয়েকজন নেতাও আলোচনায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে মনজরুল রিয়াদ, এজাজুল কবির রুয়েল এবং কাজী জিয়া উদ্দিন বাসিতের নাম সংগঠনের ভেতরে ঘুরছে।
২০০৮–০৯ সেশন থেকেই আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়াল। বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে আহত কর্মীদের চিকিৎসাসেবায় তার অবদান নিয়ে সংগঠনের ভেতরে ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি রাজপথের প্রায় সব কর্মসূচিতেই তাকে সামনের সারিতে দেখা গেছে। ছাত্রদলের মেডিকেল ইউনিট থেকে উঠে আসা এই নেতা বর্তমানে এফসিপিএস অধ্যয়নরত।
২০০৯–১০ সেশন থেকে নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছে বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান। ছাত্ররাজনীতির পথচলায় তার সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ঘটে ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর। সে সময় তাকে গুম করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হাত-পা, চোখ ও মুখ বেঁধে কয়েকদিন ধরে নির্যাতন করা হয়। একাধিকবার অজ্ঞান হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, সেই সময় তার পায়ের আটটি নখ তুলে ফেলা হয়েছিল।
এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম এবং বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদায় কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভও সম্ভাব্য নেতৃত্বের আলোচনায় আছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি রিমান্ড ও কারাবরণও করতে হয়েছে শুভকে। অভিযোগ রয়েছে, একসময় ছাত্রলীগ নেতা গোলাম রব্বানী (Golam Rabbani)-র নেতৃত্বাধীন টর্চার সেলে নির্যাতনের শিকার হন তিনি।
এবারের আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট। সেখান থেকে প্রথমবারের মতো নেতৃত্বের সম্ভাব্য তালিকায় উঠে এসেছে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক এম. রাজীবুল ইসলাম তালুকদার বিন্দুর নাম। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ১৪টি মামলার পাশাপাশি রিমান্ডে নির্যাতনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ২০০৯ সালে তার হাত ও পায়ের রগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে।
তার রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি বিভীষিকাময় দিন ছিল ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিল। সেদিন ইফতারের পর হামলার শিকার হন তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মী তার ওপর আক্রমণ চালিয়ে মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায়। একপর্যায়ে তাকে মৃত ভেবে রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যায় তারা।
অন্যদিকে ২০০৯–১০ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে প্রকাশ্যে ছাত্রদল করার কারণে কঠোর নির্যাতনের শিকার হন বর্তমান কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ আদনান। একসময় তাকে হল থেকেও বের করে দেওয়া হয়। এরপর সংগঠনের কর্মসূচিতে সক্রিয় থেকে বিশেষ করে হ’\রতাল ও অবরোধে ঝুঁকি নিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে দেখা গেছে তাকে।
সব মিলিয়ে ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে সংগঠনের ভেতরে যেমন আলোচনা বাড়ছে, তেমনি তৃণমূলের প্রত্যাশা—সংগঠনকে আবার সক্রিয় ও শক্তিশালী করতে সক্ষম এমন নেতৃত্বই সামনে আসবে।


