একুশে পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান আর নেই

বাংলা চলচ্চিত্র ও সংগীতের এক সোনালি যুগ যেন হঠাৎ করেই থেমে গেল। একুশে পদকপ্রাপ্ত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী মাহবুবা রহমান (Mahbuba Rahman) আর নেই। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এই কালজয়ী শিল্পী।

পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক—এই দীর্ঘ সময়জুড়ে রেডিও এবং চলচ্চিত্রের জগতে এক পরিচিত ও জনপ্রিয় নাম ছিলেন তিনি। পল্লীগীতি এবং আধুনিক গানে তার অনন্য দক্ষতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল। ১৯৪৭ সালে অল ইন্ডিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র থেকে তার সংগীতজীবনের সূচনা, যা পরবর্তীতে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ (Mukh O Mukhosh)-এ তার কণ্ঠই এনে দেয় নতুন মাত্রা। ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই চলচ্চিত্রে সমর দাস (Samor Das)-এর সুরে গাওয়া ‘মনের বনে দোলা লাগে’ গানটি আজও সংগীতপ্রেমীদের মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

তার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল নানা উত্থান-পতনের গল্পে ভরা। ১৯৫০ সালে প্রথম বিবাহের পর বিচ্ছেদ, এরপর ১৯৫৮ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব ও সঙ্গীতজ্ঞ খান আতাউর রহমান (Khan Ataur Rahman)-এর সঙ্গে নতুন জীবনের সূচনা। এই দম্পতির ঘরেই জন্ম নেন বিশিষ্ট শিল্পী রুমানা ইসলাম (Rumana Islam) সহ তিন সন্তান। বড় ছেলে মারুফ আগেই মারা গেছেন, আর ছোট ছেলে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

চলচ্চিত্রের পর্দায়ও তার কণ্ঠ ছিল অবিচ্ছেদ্য। জহির রায়হান (Zahir Raihan)-এর ‘কখনো আসেনি’ ছবিতে তার গাওয়া ‘নিরালা রাতের প্রথম প্রহরে’ এবং ‘তোমাকে ভালোবেসে অবশেষে কী পেলাম’ গান দুটি আজও শ্রোতাদের আবেগে নাড়া দেয়। এছাড়া ‘আসিয়া’, ‘এ দেশ তোমার আমার’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ এবং ‘সাত ভাই চম্পা’র মতো অসংখ্য কালজয়ী চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠ ছড়িয়ে আছে।

বাংলা সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্র তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। তার প্রয়াণে সংগীত ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক, আর তার রেখে যাওয়া গানগুলোই এখন স্মৃতির ভাণ্ডারে অমলিন হয়ে থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *