পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে বিশ্বাসযোগ্য যোগাযোগ, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের বিকল্প নেই—এমন বার্তাই তুলে ধরলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন (Zahir Uddin Swapan)। শুক্রবার (২৭ মার্চ) তুরস্কের ইস্তাম্বুল (Istanbul)-এ আয়োজিত আন্তর্জাতিক স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন সামিট (STRATCOM) ২০২৬-এ অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বেই উপস্থিত ছিলেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (Recep Tayyip Erdoğan), ভাইস প্রেসিডেন্ট জেভদেত ইলমাজ এবং কমিউনিকেশন বিভাগের প্রধান বুরহানেত্তিন দুরান। ‘নতুন বৈশ্বিক কাঠামো: একটি যোগাযোগের দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মন্ত্রী তুরস্ক সরকারের এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার পাশাপাশি অপতথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার বিস্তার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে কৌশলগত যোগাযোগ শুধু একটি উপাদান নয়, বরং শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এখন রাষ্ট্রগুলোর মূল্যায়নও হচ্ছে তাদের যোগাযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা ও ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অপতথ্য মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা—বিশেষ করে স্বাধীন ও পেশাদার গণমাধ্যম। তার ভাষায়, “একটি শক্তিশালী চতুর্থ স্তম্ভ ছাড়া সত্য প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনআস্থা বজায় রাখা সম্ভব নয়।”
নিজ বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশ (Bangladesh)-এর চলমান সংস্কার কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মতপ্রকাশে প্রতিবন্ধক আইনগুলো পর্যালোচনা করা এবং একটি স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
তথ্যের বিশৃঙ্খলা নিয়ে সতর্ক করে মন্ত্রী বলেন, এর সমাধান কোনো একপাক্ষিক পথে সম্ভব নয়। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কিংবা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীনতা—উভয়ই ক্ষতিকর। বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির মাধ্যমেই এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
কৌশলগত যোগাযোগের জন্য তিনি তিনটি মৌলিক নীতির ওপর জোর দেন—বিশ্বাসযোগ্যতা, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও দ্রুত ডিজিটালাইজড দেশে অপতথ্য মোকাবিলার বাস্তব চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতে স্বৈরশাসনের সময় তথ্যকে বিকৃতভাবে ব্যবহার করে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল।
ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রাপ্তি ও অবাধ প্রবাহের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নতুন, কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ অন্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে প্রস্তুত এবং একই সঙ্গে নিজস্ব অভিজ্ঞতা দিয়েও বৈশ্বিক জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে চায়।
এ সময় তুরস্ক (Turkey)-এর সঙ্গে বাংলাদেশের দৃঢ় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। বিশেষ করে রোহিঙ্গা (Rohingya) সংকটসহ বিভিন্ন মানবিক ইস্যুতে তুরস্কের সমর্থনের প্রশংসা করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক যোগাযোগ কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বর যথাযথ গুরুত্ব পাবে।
প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন উত্তর সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাহসিন এরতুগ্রুলোগ্লু, সিরিয়ার তথ্য মন্ত্রী হামজা আলমুস্তাফা এবং কাজাখস্তানের সংস্কৃতি ও তথ্য বিষয়ক উপমন্ত্রী কানাত ঝুমাবায়েভিচ ইস্কাকভ।


