চার বছর আগের ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধসের স্মৃতি এখনও তাজা, আর সেই আশঙ্কাই আবার ফিরে আসছে শ্রীলঙ্কায়। দীর্ঘস্থায়ী মধ্যপ্রাচ্যের যু’\দ্ধ এবং সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী ঘূর্ণিঝড়ের দ্বিমুখী আঘাতে দেশটির অর্থনীতি আবারও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
আল আরাবিয়া (Al Arabiya)-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জ্বালানি সরবরাহে বৈশ্বিক সংকটের কারণে প্রেসিডেন্ট ডিসানায়েকে (Dissanayake) জ্বালানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছেন। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং বিদ্যুতের খরচ সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে জ্বালানি মজুত করতে শুরু করেছে, যা ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের স্মৃতি উসকে দিচ্ছে। সে সময় দেশটি ৪৬ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয় এবং মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশে পৌঁছায়। তীব্র বিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসা (Gotabaya Rajapaksa)।
রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা
রাজাপাকসা বিরোধী ‘আরাগালায়া’ আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টি সতর্ক করেছে, বর্তমান সরকারও একই ধরনের সংকটে পড়তে পারে। দলটির পলিটব্যুরো সদস্য দুমিন্দা নাগামুয়া বলেছেন, অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়া রাজনৈতিকভাবেই সামনে আসতে পারে।
তবে আপাতত বড় ধরনের বিক্ষোভ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, জনগণ এখনও পরিস্থিতি সহ্য করছে, যদিও ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে।
সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা
রাজধানী কলম্বোর বাজারে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ সরকারের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন, আবার কেউ মনে করছেন—এই কঠিন সময় পার করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
৫৫ বছর বয়সী এক বিক্রেতা বলেন, নতুন সরকারের কাছে তারা ভালো সময়ের আশা করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবতা এখন আরও কঠিন মনে হচ্ছে। অন্যদিকে আরেক ব্যবসায়ী মনে করেন, এই অবস্থায় আন্দোলন নয়, বরং স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই জরুরি।
নীরব প্রতিবাদ, বাড়ছে উদ্বেগ
মানবাধিকার আইনজীবী ভাবানী ফনসেকা (Bhavani Fonseka) বলেন, মানুষ এখন বেঁচে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকায় বড় ধরনের প্রতিবাদ কমে গেছে। তবে জরুরি আইন প্রয়োগ করে সরকার জনবিক্ষোভ দমন করতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কায় বাড়তি চাপ
অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০০৪ সালের সুনামির পর সবচেয়ে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে গত বছর ৬৪১ জনের প্রাণহানি ঘটে এবং প্রায় পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এতে প্রায় ৪.১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
পুনর্গঠনের জন্য সরকার অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার দিকেও ঝুঁকছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) থেকে জরুরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি চলমান ঋণ কর্মসূচির শর্ত পুনর্বিবেচনার কথাও ভাবা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানি সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ—এই তিনের সম্মিলিত প্রভাবে শ্রীলঙ্কা আবারও এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে।


