বাংলাদেশের সমতল অঞ্চল ও পার্বত্য এলাকার মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য রাখা হবে না—এমন দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান (Dipen Dewan)। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল যদি উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে থাকে, তবে দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি কখনোই পূর্ণতা পাবে না। তাই পাহাড় ও সমতল—উভয় অঞ্চলকে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়াই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উৎসব—বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান কিংবা চাংলান—নামের দিক থেকে ভিন্ন হলেও এর অন্তর্নিহিত সুর এক এবং অভিন্ন। এই উৎসবগুলো পার্বত্য অঞ্চলে মৈত্রী, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের এক অনন্য বন্ধন তৈরি করে, যা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।
বাংলা নববর্ষকে ঘিরে রাঙামাটিতে আয়োজিত পাঁচ দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী মেলা ও আলোচনা সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এই আয়োজনটি অনুষ্ঠিত হয় রাঙ্গামাটি (Rangamati)-এর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলা লক্ষ্য করা যায়।
তিনি বলেন, পাহাড়ি ও বাঙালির মধ্যে যদি প্রকৃত সম্প্রীতি গড়ে তোলা যায়, তবে শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, পুরো বাংলাদেশই এগিয়ে যাবে। এ সময় তিনি জানান, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্নয়ন ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়েই তিনি পাহাড়ে এসেছেন এবং সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
উৎসবের নামকরণ নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তার ভাষায়, একে এক নামে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিচয় অনুযায়ী নাম ব্যবহার করা উচিত—চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই, ত্রিপুরাদের বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষু এবং ম্রো ও চাকদের চাংক্রান। একইসঙ্গে বাঙালিদের নববর্ষও এই উৎসবের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক বিশাল মানবিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উৎসবে রূপ নিয়েছে।
মন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, একটি জাতির অগ্রগতির সঙ্গে তার সংস্কৃতির উন্নয়ন গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই ধরনের উৎসব দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে। তিনি সকলকে শান্তিপূর্ণ ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে এই উৎসব উদযাপনের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার। এতে আরও বক্তব্য রাখেন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা, রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ নাজমুল হক, জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী, সদর জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল একরামুল রাহাত, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আব্দুর রকিব এবং সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের পরিচালক জীতেন চাকমাসহ অন্যান্যরা।
মন্ত্রী আরও বলেন, বিজু উৎসব পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলনের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এটি সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ায়। তিনি পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আতিথেয়তার প্রশংসা করে এখানকার সংস্কৃতি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজ মাঠ থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ।
পাঁচ দিনব্যাপী এই নববর্ষ ও বৈসাবী উৎসবে রয়েছে নানা আয়োজন—ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, পণ্য প্রদর্শনী, নাটক মঞ্চায়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচি। ৬ এপ্রিল শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত। বিভিন্ন স্টল বসানো হয়েছে, যেখানে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পণ্যের প্রদর্শনী চলছে।
এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু, বৈসু ও সাংগ্রাইকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে পুরো অঞ্চলে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। রাঙ্গামাটিসহ তিন পার্বত্য জেলাজুড়ে চলছে বর্ণাঢ্য আয়োজন।
প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এই উৎসব পালিত হয়। চাকমারা একে বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু এবং অহমিয়া জনগোষ্ঠী বিহু নামে উদযাপন করে। ১২ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মূল তিন দিনের উৎসব পালিত হয় প্রতিটি ঘরে ঘরে।
উৎসবের শেষ পর্ব হিসেবে আগামী ১৭ এপ্রিল রাঙ্গামাটির চিংহ্লা মং মারী স্টেডিয়ামে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে এবারের বিজু উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে।


