দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট, রাজধানীতে তবু ‘এসি বিলাশ’—প্রশ্নের মুখে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা

জ্বালানি সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন, কিন্তু তবুও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাব সামনে রেখে বড় ধরনের সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। সন্ধ্যার পর মার্কেট বন্ধ রাখা হচ্ছে, এমনকি স্কুল বন্ধ রাখার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

এই সাশ্রয় কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শুরু হয়েছে লোডশেডিং। এর ফলে বিদ্যুৎনির্ভর সেচপাম্পসহ উৎপাদনমুখী নানা খাতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অথচ দেশের এই সামগ্রিক সংকটের মাঝেও রাজধানীতে যেন অন্য এক চিত্র—চলছে এয়ারকন্ডিশনের নির্বিচার ব্যবহার।

পরিসংখ্যান বলছে, একটি এক টন এসি চালাতে প্রয়োজন হয় অন্তত ১২০০ ওয়াট বিদ্যুৎ। বিপরীতে একটি ফ্যান চালাতে লাগে মাত্র ৭৫ থেকে ১০০ ওয়াট, আর একটি এলইডি বা সিএফএল বাল্ব জ্বালাতে লাগে ২০ থেকে ১০০ ওয়াট। অর্থাৎ একটি এসি যত বিদ্যুৎ খরচ করে, সেই একই বিদ্যুতে ৬-৭টি ফ্যান এবং অন্তত ১০টি লাইট চালানো সম্ভব—যা একটি পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন সরকারি ভবনে এখনও চলছে হাজার হাজার টনের এসি। তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজস্ব ভবন, পানি ভবন ও অর্থ ভবনেই ব্যবহৃত হচ্ছে সাড়ে ৬ হাজার টনের বেশি এসি। এই বিদ্যুৎ দিয়ে অন্তত ৬ হাজার পরিবারকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যেত। এর বাইরেও নির্বাচন ট্রেনিং সেন্টার, ডাক ভবন, আইসিটি ভবন, বিজ্ঞান জাদুঘর ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রায় সব সরকারি ভবনেই চলছে ব্যাপক এসি ব্যবহার।

সরকারি ভবনে যখন এই চিত্র, তখন বেসরকারি খাতও পিছিয়ে নেই। ২০১৯ সালে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (Center for Atmospheric Pollution Studies)-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার ১১৬৮টি ভবনে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার এসি, যা টনের হিসাবে প্রায় ৮৪ লাখ টনেরও বেশি। এতে শুধু বিদ্যুতের অপচয়ই নয়, বরং শহরের ওপর বাড়তি তাপের চাপ তৈরি হচ্ছে।

এ বিষয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (Stamford University)-এর বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও কেন্দ্রটির চেয়ারম্যান ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ১০০ স্কয়ারফিট জায়গা ঠান্ডা করতে ব্যবহৃত ১ টন এসি ঘরের তাপমাত্রা ৪-৫ ডিগ্রি কমালেও বাইরে একই পরিমাণ জায়গার তাপমাত্রা ৪-৫ ডিগ্রি বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি এসির আউটডোর ইউনিট আশপাশের ১০-১২ ফুট এলাকা পর্যন্ত উত্তপ্ত করে তোলে। কোথাও কোথাও এমন তাপমাত্রা তৈরি হয় যে মনে হয় আগুন লেগে যেতে পারে। তার মতে, ঢাকার মতো শহরে এই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্বে বিরল।

এদিকে জ্বালানি ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং খাদ্য উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেচ ব্যাহত হলে কয়েক মাসের মধ্যেই খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে। তাই শহরের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমিয়ে পল্লী বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখা জরুরি।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ (Change Initiative)-এর নির্বাহী পরিচালক এম জাকির হোসাইন খান বলেন, প্রয়োজনে শহরে নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে হলেও গ্রামে সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সতর্ক করেন, জ্বালানি ও খাদ্য—দুই ক্ষেত্রেই আমদানিনির্ভরতা বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাই খাদ্য নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এসি ব্যবহারের মতো বিলাসিতা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

একই সুর শোনা যায় একশনএইড বাংলাদেশ (ActionAid Bangladesh)-এর নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদের বক্তব্যেও। তিনি বলেন, বর্তমান জ্বালানি মজুদকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বণ্টন করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের কারণে পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থাও ব্যাহত হচ্ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রায় ১৩-১৪ লাখ সেচ পাম্পের মধ্যে অধিকাংশই ডিজেলে চলে। সোলার পাম্পের সংখ্যা মাত্র ৪ হাজার। অথচ তুলনামূলক কম খরচেই এই পাম্পগুলো সোলারে রূপান্তর করা সম্ভব। ছোট পাম্পে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা এবং বড় পাম্পে ৮-১০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই রূপান্তর দ্রুত সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটকে সুযোগে পরিণত করা যেতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে গ্রামভিত্তিক অফগ্রিড বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান সম্ভব। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে বিদ্যুৎ অপচয় রোধ এবং এসি ব্যবহার কমানো ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই বলেও তারা মনে করছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *