অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো ধরনের সংশোধনী ছাড়াই পাস করার যে রাজনৈতিক সমঝোতা গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬’ পাস করায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিরোধী দল। পুরো প্রক্রিয়াকে ‘দিনদুপুরে রাজনৈতিক জোচ্চুরি’ এবং ‘প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের মহোৎসব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম (Nahid Islam)।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সংসদ অধিবেশনে বিলটি পাস হওয়ার পর অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই অভিযোগ তোলেন। এর আগে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী (Nitai Roy Chowdhury) বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন।
রাজনৈতিক সমঝোতা ভঙ্গের বিষয়টি তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, মাননীয় স্পিকার অবগত আছেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো নিয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেখানে ৯৮টি অধ্যাদেশ ‘অ্যাজ ইট ইজ’ বা অপরিবর্তিত অবস্থায় সংসদে বিল আকারে আনা এবং পাস করার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিলটিও সেই তালিকার অংশ ছিল। কিন্তু বিলটি উত্থাপনের মাত্র আধা ঘণ্টা আগে সংশোধনী আনা হয়েছে, যা সরাসরি সেই ঐকমত্য বা ‘কনসেনসাস’ ভঙ্গ করেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তারা চাইলে যেকোনো বিল পাস করাতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—তাহলে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রয়োজন কী ছিল? যদি বিরোধী মতামত শোনার সুযোগই না থাকে, তাহলে সংসদের ভূমিকা কোথায়? তার ভাষায়, “দিনদুপুরে ছলচাতুরি করে এই সংশোধনী পাস করানো হয়েছে।”
বিলের সংশোধনীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। পূর্বের খসড়ায় বলা ছিল, সরকার কর্তৃক নিয়োজিত একজন ‘বিশেষজ্ঞ’ জাদুঘর পর্ষদের প্রধান হবেন। কিন্তু সংশোধিত প্রস্তাবে সংস্কৃতি মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীকে সেই পদে বসানোর কথা বলা হয়েছে। নাহিদের যুক্তি, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি বা জাতীয় জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানে সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞদেরই নেতৃত্ব দেওয়া হয়—এটাই প্রতিষ্ঠিত রীতি। জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাদুঘর একটি স্বতন্ত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, সেটিকে কেন সরাসরি মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো একের পর এক রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank) থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার কাঠামো—সবখানেই একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (Bangladesh Cricket Board) নিয়েও তিনি অভিযোগ করেন, সেখানে দলীয়করণ ও পরিবারকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সব পক্ষের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু নতুন আইনের মাধ্যমে সরকার জাদুঘরটিকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাচ্ছে। এতে করে বোর্ড থেকে যে কাউকে বাদ দেওয়ার ক্ষমতাও সরকারের হাতে চলে যাবে, যা একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এই নজিরবিহীন দলীয়করণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো জরুরি। “এভাবে চলতে থাকলে সংসদে থাকারই কোনো অর্থ থাকে না,”—এমন মন্তব্য করে তিনি সংশোধনী প্রত্যাহার করে আগের ঐকমত্য অনুযায়ী বিল পাসের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন—রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণেই চলে যাবে?


