চিকিৎসকরাই মানুষের সংকটে প্রকৃত সহচর—স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর প্রধানমন্ত্রীর

চিকিৎসা পেশার মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman) বলেছেন, চিকিৎসকরাই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। তিনি উল্লেখ করেন, একজন চিকিৎসকের পরামর্শ ও আন্তরিক আচরণ রোগীর কাছে ওষুধের মতোই কার্যকর হয়ে ওঠে। তাই পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ হওয়াও একজন চিকিৎসকের জন্য অপরিহার্য।

শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের (ইউএইচএফপিও) ঢাকা সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি মনে করেন, অন্যান্য পেশার তুলনায় চিকিৎসা পেশার ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং এই বাস্তবতায় উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ’ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে স্বাস্থ্যনীতির যে রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছিল, তার অন্যতম মূলনীতি হলো—প্রতিরোধই উত্তম চিকিৎসা। রোগের প্রাথমিক পর্যায়েই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে তা বিস্তার রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এই নীতি বাস্তবায়নে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারেক রহমান বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো শহরকেন্দ্রিক সেবা ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, উন্নত হাসপাতাল এবং আধুনিক ল্যাব সুবিধা প্রায় সবই রাজধানী বা বড় শহরে সীমাবদ্ধ। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন চিকিৎসকরা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন, অন্যদিকে রোগীদের ঢাকামুখী হয়ে শারীরিক ও আর্থিক কষ্টও কমবে। শহর ও গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য দূর করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যদিও এই প্রক্রিয়া স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করা হবে।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। তাই সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণেও জোর দেওয়া হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত প্রভাবের কারণে শ্বাসকষ্ট, স্ট্রোক, হৃদরোগের মতো সমস্যাও বাড়ছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের স্ক্রিনিং চালু করা জরুরি। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তার মতে, ভেজালমুক্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে আরও সহজ।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারাই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে তারা প্রথম সারির কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন দিক—ওষুধ শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, আধুনিক প্রযুক্তি ও বায়োটেকনোলজি—উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এ খাতের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি প্রয়াত পুষ্টিবিদ জ্যাক লালেন (Jack LaLanne)-এর একটি উক্তি তুলে ধরে বলেন, “আজকের স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।” এই ভাবনা থেকে যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS)-এর আদলে প্রতিটি উপজেলায় এবং পরবর্তীতে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এই ইউনিটগুলো পরিচালনার জন্য সারা দেশে এক লাখ হেলথ কেয়ার কর্মী নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাদের ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করবেন।

মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পূর্ণাঙ্গ মাতৃত্বকালীন সেবা ও নিরাপদ প্রসবের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

তিনি অতীতে শিশুদের হামের টিকা না দেওয়ার বিষয়টিকে ‘জীবনবিনাশী ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি জানান।

দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নাগরিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এটি কোনো করুণা নয় বরং মৌলিক অধিকার।

তিনি আরও জানান, সরকার শিগগিরই একটি সমন্বিত ই-হেলথ কার্ড চালু করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে নাগরিকদের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত থাকবে। এতে দেশের যেকোনো হাসপাতালে সহজে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ সম্ভব হবে। পাশাপাশি একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা ব্যবস্থাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে চিকিৎসা ব্যয়ে কেউ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

স্বাস্থ্যকর্মীদের আবাসন, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়েও সরকার সচেতন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিজেদের কর্মস্থলকে জবাবদিহিমূলক ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মডেলে পরিণত করবেন।

শেষে তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই মূল কারিগর। সবার জন্য সহজলভ্য, কার্যকর ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *