বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অবশেষে প্রকাশিত হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union)-এর চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে একদিকে যেমন নির্বাচনকে সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সংস্কারের সুপারিশও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ইইউর প্রধান পর্যবেক্ষক আইভার্স ইজাবস (Ivars Ijabs)। তিনি জানান, নির্বাচনটি নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়াটি ছিল পেশাদারভাবে পরিচালিত এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তবে এই ইতিবাচক মূল্যায়নের পাশাপাশি ইইউ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের দিকও তুলে ধরেছে, যা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ করে নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতার অভাব, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর দুর্বলতা এবং ভোট গণনার প্রক্রিয়ায় উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে। এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে ইইউ।
প্রধান সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচনী আইন সংস্কার, ভোট গণনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার, নির্বাচনী ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ডাকযোগে ভোটদানের সুযোগ সম্প্রসারণ।
ইইউ সতর্ক করে বলেছে, নির্বাচনী ব্যয়ের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ কারণে ব্যয়ের হিসাব বাধ্যতামূলক করা এবং তা নিরীক্ষাযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে আইভার্স ইজাবস বলেন, “নির্বাচনী প্রচারণার ব্যয় স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ এবং স্পষ্ট নিয়মকানুন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়।”
নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। ইজাবস এ প্রসঙ্গে বলেন, “বাংলাদেশকে তার নিজস্ব ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোয় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।”
ডাকযোগে ভোটদানের ব্যবস্থাকে ইতিবাচক হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও এতে আরও উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করে ইইউ। বিশেষ করে প্রবাসী ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সবশেষে, ইইউর মূল্যায়নে উঠে এসেছে—এই নির্বাচন একটি অগ্রগতির ইঙ্গিত বহন করে, তবে ভবিষ্যতে আরও গ্রহণযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে ধারাবাহিক সংস্কার অপরিহার্য।


