প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো অবকাঠামো বা সম্পদ নয়, বরং জনগণের আস্থা। এই আস্থা রাতারাতি তৈরি হয় না; বরং সরকার ও প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তা গড়ে ওঠে। তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও সচেতন ও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান।
বুধবার (৬ মে) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র (Bangladesh-China International Conference Center)-এ অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (Bangladesh Administrative Service Association)-এর বার্ষিক সম্মিলন ২০২৬-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের উদ্দেশে স্পষ্টভাবে বলেন—জনগণের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে যেন কোনো ধরনের ভয় বা দ্বিধা তাদের পিছু টানতে না পারে।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে তুলে ধরেন, দলীয়ভাবে প্রণীত ইশতেহার বাস্তবায়নের পক্ষে জনগণ ইতোমধ্যেই সমর্থন দিয়েছে। ফলে এটি এখন আর কেবল বিএনপি (BNP)-র দলীয় প্রতিশ্রুতি নয়; এটি রূপ নিয়েছে জনগণের ইশতেহারে। সেই ইশতেহার বাস্তবায়নই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
তিনি বলেন, সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে জন প্রশাসন। প্রশাসনের সাফল্যই শেষ পর্যন্ত সরকারের সাফল্য হিসেবে প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের তিনি “সরকারের প্রশাসনিক রাষ্ট্রদূত” হিসেবে অভিহিত করেন।
সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি, এবং সেই প্রত্যাশা পূরণে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। “আমরা প্রায়ই বলি, জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। সেই মালিক যখন সেবা নিতে আসে, তখন তার অভিজ্ঞতায় যেন সেই মালিকানার প্রতিফলন থাকে—এটি নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব,” বলেন তিনি।
একজন সাধারণ নাগরিক যখন সরকারি অফিসে যান, তখন তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীর আচরণের মধ্য দিয়েই পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মূল্যায়ন করেন—এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একটি উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, একজন দিনমজুর জন্মনিবন্ধন সংশোধনের মতো একটি সাধারণ সেবা নিতে গিয়ে যদি বিভ্রান্ত হন বা হয়রানির শিকার হন, তাহলে তার কাছে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। বিপরীতে, আন্তরিকতা ও সহযোগিতা পেলে তার মনে আস্থা জন্মায়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান সবসময় সম্ভব না হলেও, সেবাগ্রহীতার মনে এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে প্রশাসন তার পাশে আছে এবং সমস্যার সমাধানে আন্তরিক।
প্রধানমন্ত্রী প্রশাসনকে আরও জনমুখী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে মানুষ দ্রুত, স্বচ্ছ এবং হয়রানিমুক্ত সেবা পাবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিকতার গুরুত্বও তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন। একজন বৃদ্ধ বা অসহায় ব্যক্তি সেবা নিতে এলে তার প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ দেখানো কেবল দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবিক চেহারার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, সেবাগ্রহীতার প্রতি আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল আচরণ ছোট বিষয় মনে হলেও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী। এভাবেই রাষ্ট্রের প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
তারেক রহমান আরও বলেন, প্রশাসন কেবল আইন প্রয়োগের যন্ত্র নয়; এটি মানুষের সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। দেশের সমস্যা যেমন অসংখ্য, তেমনি সম্ভাবনাও সীমাহীন—এই বিশ্বাস ব্যক্ত করে তিনি বলেন, দেশের তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে সেটিই হবে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ জাগ্রত রাখা জরুরি। পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধ শক্তিশালী হলে রাষ্ট্রীয় ভিত্তিও মজবুত হয়, কারণ পরিবারই রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম একক।
শেষে তিনি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, দেশ ও জনগণের কল্যাণে তারা যেন নির্ভয়ে, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকার তাদের যেকোনো আইনগত ও মানবিক উদ্যোগে পূর্ণ সহায়তা দেবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।


