বর্তমান বাংলাদেশে গণতন্ত্র, নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে একটি কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরির অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—যেখানে কেউ কেউ সংস্কারের কথা বলে জাতীয় নির্বাচনকে পিছিয়ে দেওয়ার একধরনের ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চাইছে। অথচ বাস্তবতা হলো, কোনো টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়নের পূর্বশর্তই হলো একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন। কারণ নির্বাচন হলো সেই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণ নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেয়, এবং সেই প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার, নীতি ও পরিকল্পনা।
বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব এবং তার ভিত্তি হিসেবে থাকা ২০১৬ সালের ‘ভিশন ২০৩০’ বাস্তবিকভাবে প্রমাণ করে, দলটি কোনো নির্বাচনী পরিস্থিতির সুযোগে হঠাৎ সংস্কারের কথা বলেনি—বরং বছরের পর বছর ধরে একটি পরিপূর্ণ, জনসম্পৃক্ত এবং প্রয়োগযোগ্য রোডম্যাপ প্রস্তুত করেছে। তবুও যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কেউ কেউ বলে বিএনপি নাকি সংস্কার চায় না, তখন প্রশ্ন উঠে—এই অপপ্রচারের উদ্দেশ্য কী?
সুতরাং আসুন, নির্বাচন ঠেকানোর জন্য সংস্কারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঢাল না বানিয়ে, টেকসই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচনকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করি।
কিছু ঐতিহাসিক প্রশ্ন:
(১) বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার প্রস্তাবনা কোন রাজনৈতিক দল দিয়েছিলো?
**উত্তর বিএনপির ২০১৬ সালে প্রণীত ‘ভিশন ২০৩০’-এর ছয় নম্বর দফায় প্রথমবারের মতো সংসদে উচ্চকক্ষের কথা বলা হয়, যা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique Rahman) -এর ২০২২ সালের ঘোষিত ২৭ দফা ও ২০২৩ সালের ঘোষিত ৩১ দফাতেও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
(২) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাবও কি বিএনপি সর্বপ্রথম দিয়েছিলো?
উত্তর: হ্যা — ৩১ দফার পঞ্চম দফায় সুস্পষ্ট রয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি পরপর দুই টার্মের বেশি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন না। ফ্যাসিবাদের এমন একটি সময়ে জনগণের ভোটের অবশ্যম্ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রস্তাব দেন, যখন শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) নিজের অবৈধ প্রধানমন্ত্রীত্ব কুক্ষিগত রাখতে নজিরবিহীন গুম-খুন, হামলা-মামলা, দমন-নিপীড়ন চালাতে থাকেন। টাইম মেশিন দিয়ে সেই রক্তস্নাত সময়টাতে ফিরে গেলে বোঝা যাবে এই উদার প্রস্তাবনার মহাত্ম্য।
(৩) প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়ে ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০ থেকে শুরু করে ৩১ দফায় বিএনপি কি বলেছিলো?
উত্তর: বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর ওপর ন্যস্ত হওয়ায়, বিএনপি এই পদ্ধতির পরিপন্থী এবং ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা প্রস্তাব করে আসছে গত এক দশক ধরে। শেখ হাসিনার সময়ে একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স আনার জন্য সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর নিয়োগে অল-পার্টি পার্লামেন্টারী কমিটির ভেটিং, এবং বিষয়ভিত্তিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাব করে বিএনপির ৩১ দফা।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন:
(১) অধিকাংশ মৌলিক সংস্কারের প্রধান প্রস্তাবক যদি বিএনপি হয়, তবে কেন একটি ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না?
উত্তর: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেকোনো অর্থবহ পরিবর্তনের টেকসই সমাধান হলো জাতীয় নির্বাচন। যদিও সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, তবে যখন সংস্কার বনাম নির্বাচন—এই দুইকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে জনগণের ভোটাধিকার হরণের একটি ন্যারেটিভ গড়ে তোলা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—এর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য রয়েছে কি না।
আজ থেকে দুই বছর আগে, যখন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা কেউ চিন্তাও করেনি, তখন রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের জন্য বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো ৩১ দফার সুবিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনা দিয়েছিলো, যার ভিত্তি ছিল ২০১৬ সালের ‘ভিশন ২০৩০’।
আজ যদি কেউ বিএনপির দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন পদ্ধতির কিছু ভিন্নতার কারণে বলে যে বিএনপিই সংস্কার চায় না—তাহলে তা অজ্ঞতা, অপপ্রচার না অপরাজনীতি—তা জানার জন্য গবেষণা জরুরি।
(২) দ্বিকক্ষের উচ্চকক্ষে বিএনপি কেন নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতকে প্রস্তাব করেছে?
উত্তর: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের মূল লক্ষ্য হলো দক্ষ পেশাজীবীদের (যেমন, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী) রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত করা। পরাজিত প্রার্থীদের পদায়ন এর লক্ষ্য নয়। যেহেতু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নতুন বিষয়, তাই উচ্চকক্ষ গঠনের সময় পরীক্ষামূলক পদ্ধতির বদলে পরিচিত আসনভিত্তিক পদ্ধতিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত। পরবর্তীতে উচ্চকক্ষের প্রক্রিয়া পরিপক্ক হলে ও জনগণের বোঝাপড়া তৈরি হলে নমিনেশন প্রক্রিয়া পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ থাকবে।
(৩) আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান কি?
উত্তর: ফ্যাসিবাদের ১৬ বছরে সবচেয়ে বেশি গুম-খুন, হামলা-মামলার শিকার দল হিসেবে, বিএনপি (BNP) বারবার বলেছে—প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগ এবং ব্যক্তিগতভাবে এর নেতৃত্বের মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার হওয়া জরুরি। তবে গত সাত মাসে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকা এবং বিচারিক আদালতের স্থবিরতা একটি রহস্য। এই বিচার যেন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার না হয়, টেকসই হয় এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে—সেই নিশ্চয়তা জরুরি।
(৪) সংস্কারের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান আসলে কি?
উত্তর: সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে বিএনপির অবস্থান থেকে বোঝা যায়—দলটি জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য পপুলিস্ট বক্তব্য না দিয়ে, বাস্তবসম্মত পলিসি দিচ্ছে যা প্রয়োগযোগ্য। কারণ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপির বিজয় অনিবার্য, এবং তখন সংস্কার বাস্তবায়নের দায়বদ্ধতাও থাকবে। এই প্র্যাগম্যাটিক ও সাস্টেইনেবল এপ্রোচ গণতন্ত্রেরই অংশ।
৩১ দফা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত, কনসালটেশন, ডায়ালগ ও ফিডব্যাকের ভিত্তিতে। তাই এটি শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলীয় প্রস্তাবনা নয়, বরং একটি জনসম্পৃক্ত রোডম্যাপ।
(৫) সংস্কার আর নির্বাচনের সম্পর্ক তাহলে কি?
উত্তর: গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী, সকল ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের নিজস্ব মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের চাবিকাঠি হলো জাতীয় নির্বাচন। জনমতের ভিত্তিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারেন।
সুতরাং সকল রাজনৈতিক দলের উচিত তাদের সংস্কার প্রস্তাবনা জনসমক্ষে তুলে ধরা, যেন জনগণ ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, জনপ্রতিনিধিদের সেই সংস্কার বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে হবে।
**সুতরাং আসুন, নির্বাচন ঠেকানোর জন্য সংস্কারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ঢাল না বানিয়ে, টেকসই সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচনকে অত্যাবশ্যকীয় হিসেবে বিবেচনা করি।