জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনে টানাপোড়েন: প্রতিশ্রুত সব আসনেই আছেন দুই দলের প্রার্থীরাই

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের আলোচনার মধ্যেই মাঠের বাস্তবতায় দেখা দিয়েছে বিস্ময়কর সমন্বয়হীনতা। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (Islami Andolon) পরস্পরকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া আসনগুলোতেও উভয় দল মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে, যা জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

জামায়াত এবার ২৭৬টি এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। এনসিপি, এলডিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি এবং বিডিপি’র মতো শরিক দলগুলোর জন্য জামায়াত ২৪টি আসনে প্রার্থী দেয়নি। এর মধ্যে অনেক আসনে ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থীরা রয়েছেন, যা জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে।

দ্বৈত মনোনয়ন: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের চিত্র

জামায়াত যে আসনগুলোতে ইসলামী আন্দোলনের জন্য প্রার্থী না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেখানেও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মনোনয়ন জমা পড়েছে। একইভাবে, ইসলামী আন্দোলন যেসব আসন জামায়াতকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিল, সেসবেও মনোনয়ন জমা দিয়েছে হাতপাখার প্রার্থীরা।

একটি নজির হলো রংপুর-৪ আসন। জামায়াত এই আসন ছেড়ে দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেনের জন্য। তবে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এই আসনে।

এনসিপির অপর মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন, যেখানে জামায়াতও প্রার্থী দিয়েছে এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীও রয়েছেন।

এনসিপি ও অন্যান্য শরিকদের জন্য জামায়াতের ছাড়

জামায়াত এবার নতুন দল এনসিপিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ৩০টি আসন ছেড়ে দিয়েছে, যা নিয়ে চরমোনাই পীরের দল ক্ষুব্ধ। কুড়িগ্রাম-২ ও ঢাকা-৮–এর মতো জামায়াতের শক্ত আসনেও এনসিপির নেতা ড. আতিক মুজাহিদ ও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর জন্য প্রার্থী দেয়নি জামায়াত। এ আসনগুলোতেও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী রয়েছেন।

অন্যদিকে এলডিপি, বাংলাদেশ খেলাফত ও এবি পার্টির নেতাদের জন্যও জামায়াত একাধিক আসনে প্রার্থী দেয়নি—যেমন ঢাকা-১৩, কিশোরগঞ্জ-৬, হবিগঞ্জ-৪, নারায়ণগঞ্জ-৫, ফেনী-২, বরিশাল-৩, চট্টগ্রাম-১৪, ময়মনসিংহ-৯। তবে এসব আসনের অধিকাংশেই ইসলামী আন্দোলন প্রার্থী দিয়েছে।

চরমোনাইয়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের আসনে জামায়াতের প্রার্থী

চরমোনাই পীরের ভাই সৈয়দ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ ও ৬ আসনে মনোনয়নপত্র দিয়েছেন। জামায়াত এ দুটি আসন ছাড়বে বললেও বাস্তবে সেখানে প্রার্থী দিয়েছে। একইভাবে তাঁর দুই ভাই এবং দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্যরাও প্রার্থী হয়েছেন এমন আসনেও জামায়াতের প্রার্থী রয়েছে।

জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধেও হাতপাখা

চরমোনাইপন্থী ইসলামী আন্দোলন জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধেও প্রার্থী দিয়েছে। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫), মুজিবুর রহমান (রাজশাহী-১), মিয়া গোলাম পরওয়ার (খুলনা-৫), এটিএম আজহারুল ইসলাম (রংপুর-২), রফিকুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৪), হামিদুর রহমান আযাদ (কক্সবাজার-২)—সবার আসনেই হাতপাখার প্রার্থী রয়েছেন।

জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়

এই অবস্থায় জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে প্রকৃত জোট হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই উভয় দল জোটের শরিকদের প্রতি প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবতায় তা মানা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে “কৌশলগত দ্বিচারিতা” হিসেবে দেখছেন।

একদিকে শরিকদের জন্য আসন ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা, অন্যদিকে ঐসব আসনে নিজ দলের কিংবা শরিক দলের প্রার্থী থাকা—এই পরিস্থিতি এক জোটভিত্তিক নির্বাচনী প্রচারণাকে দুর্বল করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *