দীর্ঘ আট বছর পর সরাসরি দলের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়ে যাত্রা শুরু করলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। গত ৯ জানুয়ারি ভারমুক্ত হয়ে তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দলকে সাংগঠনিকভাবে সামনে এগিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় কাটছে তার।
অনেকের ধারণা, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনসহ দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে তিনি এক ধরনের নিয়ামকের ভূমিকা পালন করবেন।
বিএনপির মতো বৃহৎ রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণকে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা ও বিশ্লেষকরা স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন। তাদের মতে, তিনি হঠাৎ করে বা বিশেষ কোনও পরিস্থিতিতে নেতৃত্বে আসেননি; বরং ধারাবাহিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। তিনি নিজেও জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন এবং দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন।
পাশাপাশি বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন তিনি যৌবন থেকেই লালন করেছেন। মায়ের হাত ধরেই রাজনীতির হাতেখড়ি এবং প্রাথমিক সদস্যপদ পূরণের পর থেকেই দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
আগামীতে দেশের গণতন্ত্র ও মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন—এমন প্রত্যাশা করছেন রাজনীতিবিদরা। তাদের মতে, এর মাধ্যমেই নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথ সুগম হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “বিএনপি অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এবং জনগণ তাদের শাসন দেখেছে। তবে তারেক রহমান পূর্ণাঙ্গ নেতৃত্ব পাওয়ার পর রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে। এক্ষেত্রে দেখতে হবে, ভবিষ্যতে দল কী ধরনের রাজনীতি চর্চা করে।”
তিনি বলেন, “অতীতে বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতার অংশীদার করেছিল। আমার মনে হয়, এবার তারা সে পথে যাবে না। তারা বারবার মুক্তিযুদ্ধকে সংহত করার কথা বলছে এবং বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল না করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তার নেতৃত্বে বিএনপি পরিচালিত হলে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা যাবে।”
আত্মবিশ্বাস ছিল নেতাকর্মীদের, অবশেষে ফিরলেন ‘অভিভাবক’
২০১৮ সালের পর থেকে কারাবরণ, অসুস্থতা ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরাসরি দায়িত্ব পালন করতে না পারলেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দলকে সংগঠিত রেখেছেন।
এই সময়ে নেতাকর্মীরা দুটি শূন্যতা অনুভব করতেন—একদিকে তারেক রহমান বিদেশে অবস্থান করছিলেন এবং অনলাইনের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, অন্যদিকে তিনি ছিলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। ফলে দেশে নেতাকর্মীরা এক ধরনের ‘অভিভাবকহীনতা’ অনুভব করতেন এবং প্রতিপক্ষের নানা কটূক্তির মুখে পড়তেন।
তবুও নেতাকর্মীদের আত্মবিশ্বাস ছিল, তারেক রহমান বীরের বেশেই দেশে ফিরবেন। জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে গত ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছর পর তিনি দেশে ফেরেন। সর্বশেষ গত ৯ জানুয়ারি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ভারমুক্ত হয়ে দলের চেয়ারম্যান হন।
যেভাবে নেতৃত্বে এসেছিলেন জিয়া ও খালেদা
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি হন মেজর জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হলে বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে পড়ে।
এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি দলে যোগ দেন খালেদা জিয়া। সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতির কঠিন পথে যাত্রা করে দ্রুতই গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বেই দীর্ঘ সময় বিএনপি পরিচালিত হয়েছে।
তৃণমূল থেকে শীর্ষে তারেক রহমান
১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ পূরণের মাধ্যমে তারেক রহমানের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মায়ের সঙ্গে রাজনীতির বাস্তব পাঠ নেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে দলীয় তরুণদের সংগঠিত করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০০২ সালে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এক-এগারোর সরকারের সময়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও, বিদেশে বসে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন দৃঢ়ভাবে।
সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা
গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেই জনতার উদ্দেশে তারেক রহমান বলেছিলেন, “প্রিয় বাংলাদেশ উই হ্যাভ আ প্ল্যান। উই হ্যাভ আ প্ল্যান ফর দ্য পিপল, ফর দ্য কান্ট্রি।” দিয়েছেন ঐক্যের ডাক। তাই মায়ের মৃত্যুর পর তাকে সান্ত্বনা দিতে গুলশানের কার্যালয়ে ছুটে যান ভিন্ন মতে রাজনৈতিক দলের নেতারাও। পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী ও কূটনৈতিকরাও তার শোকের সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনিও সবার সঙ্গে আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলেন।
এই বক্তব্য ও আচরণকে অনেকেই তার রাজনৈতিক পরিপক্বতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। বিভাজনের রাজনীতির বাইরে গিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে বার্তা তিনি দিয়েছেন, তা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থেকেও রাজনৈতিক সংযোগ ও সংলাপের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অভিজ্ঞতা তাকে আরও সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বে অভ্যস্ত করেছে—এমন মূল্যায়নও উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘ঐক্যের ডাক’ শুধু আবেগঘন মুহূর্তের বক্তব্য নয়, বরং আগামী দিনে বিএনপির রাজনীতির সম্ভাব্য রূপরেখারই ইঙ্গিত দেয়। ভিন্ন মত ও পথের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার এই অবস্থান বাস্তবায়িত হলে তা দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সমুন্নত রাখার বার্তা
চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের একদিন পরই গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তারেক রহমান। শনিবার (১০ জানুয়ারি) বনানীর হোটেল শেরাটনে অনুষ্ঠিত এ সভায় তিনি বলেন, সামনে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু তা যেন জাতিকে বিভক্ত না করে—সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। যেকোনও মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে।
এক সাংবাদিকের ‘মাননীয়’ সম্বোধনের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “দয়া করে আমার নামের আগে মাননীয় সম্বোধন করবেন না।”
রাজনীতিবিদদের প্রত্যাশা
জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বে আসায় তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন অনেকে। তারা মনে করেন, এতে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আশা করি গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে তিনি ভূমিকা রাখবেন এবং দেশ নিয়ে যে রূপকল্পের কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন।
১২ দলীয় জোটের সাবেক মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, তারেক রহমানের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। দলের ঐক্য ও চেইন অব কমান্ড ঠিক রাখতে প্রয়োজনে তাকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে।
এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশের কঠিন সময়ে জাতি তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছে। কঠিন সময়ে বিদেশ থেকে ফিরেছেন তিনি। বুক ভরা আশা নিয়ে জাতি তার দিকে তাকিয়ে আছে। শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরে বনানীতে একটি রেস্টুরেন্টে সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে তারেক রহমানের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।


