নির্বাচন: স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আসছে বিএনপি’র নির্বাচনী ইস্তেহার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠনের এক বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party – BNP)। দলটির নেতারা বলছেন, এবারের নির্বাচনি ইশতেহার শুধুমাত্র ভোটার আকৃষ্ট করার একটি প্রচারপত্র নয়, বরং গণতান্ত্রিক উত্তরণের পর দেশের ভবিষ্যৎ কাঠামো গড়ার একটি সমন্বিত নীতিগত রূপরেখা হবে এটি।

দলের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফার আলোকে তৈরি হচ্ছে এবারের ইশতেহার। লক্ষ্য একটাই—বিকল্প রাষ্ট্রচিন্তার ধারায় গণমানুষের আস্থা ফেরানো এবং তরুণদের মন জয় করা।

তরুণদের কর্মসংস্থান ও বেকার ভাতা—বিএনপির প্রতিশ্রুতি

নির্বাচন কমিশন-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটারের মধ্যে ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সি তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটির বেশি। এর মধ্য থেকে অন্তত আড়াই কোটির বেশি ভোটার ২২ থেকে ২৯ বছর বয়সের মধ্যে, যারা ২০০৮ সালের পর থেকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি।

এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্রে রেখে বিএনপি তাদের ইশতেহারে একাধিক পরিকল্পনার কথা বলছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন—
“তরুণদের কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সহায়তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, ট্রেইনিং প্রোগ্রাম এবং বেকার ভাতা চালুর ব্যাপারে বিস্তারিত পরিকল্পনা ইশতেহারে থাকবে।”

দলটি জানিয়েছে, তরুণদের জন্য থাকবে একাধিক ধাপে ট্রেইনিং ও স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, যার মাধ্যমে ডিজিটাল ইকোনমির সাথে সঙ্গতি রেখে একটি কর্মক্ষম, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আধুনিক শ্রমবাজার গড়ে তোলা হবে।

তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য থাকবে স্টার্টআপ ফান্ড, সহজ শর্তে ঋণ এবং কর ছাড় সুবিধা।

স্বাস্থ্য খাতে বিপ্লব ঘটানোর অঙ্গীকার

তারেক রহমান-এর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বিএনপি এনএইচএস (NHS)-এর আদলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালুর পরিকল্পনা করেছে।

স্বাস্থ্যখাতে বিএনপির ঘোষিত কিছু পরিকল্পনা:
প্রত্যেক নাগরিকের জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা বিনামূল্যে
জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ স্বাস্থ্যখাতে
প্রতি গ্রামে একজনের বেশি পল্লী চিকিৎসক
এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, নারীদের অগ্রাধিকার
জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি
২৪ ঘণ্টার স্বাস্থ্য হেল্পলাইন
স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

এছাড়া BNP-এর পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা মান উন্নত করা হবে, বেসরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর কঠোর নীতিমালা আরোপ করে সেবার মান নিশ্চিত করা হবে।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ কর্মসূচি

বিএনপি ইতিমধ্যে প্রচারণায় নিয়ে এসেছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নামে দুটি বৃহৎ কর্মসূচি।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে:
– পরিবারের আয়ের স্তরের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনীয় সেবা ও ভর্তুকি দেওয়া হবে
– দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষভাবে নিশ্চিত করা হবে
– ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিবারভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ করা হবে যাতে সরকারি সহায়তা সঠিকভাবে পৌঁছায়

এই কর্মসূচি তরুণ ভোটারদের কাছে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যাদের অনেকেই পরিবারভিত্তিক সুরক্ষার বাইরে রয়েছেন।

সাতটি মূল খাতে জোর

বিএনপির ইশতেহারে সাতটি মূল খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে:
1. জলবায়ু ও পরিবেশ: কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, বন সংরক্ষণ, পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি ব্যবস্থাপনা
2. শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি: টেকসই শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মমুখী কারিকুলাম, আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি শিক্ষা
3. স্বাস্থ্য: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক চিকিৎসা, বিশেষায়িত হাসপাতাল, গবেষণা
4. কৃষি: কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষকের সহায়তা ফান্ড, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি
5. নারী: নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত
6. ক্রীড়া: জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা, যুব উন্নয়ন কেন্দ্র
7. ধর্ম: ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা, উগ্রবাদ মোকাবিলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরদার

ভিশন ২০৩০ ও ৩১ দফার ধারাবাহিকতা

২০১৭ সালে খালেদা জিয়া যে ‘ভিশন ২০৩০’ উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, এবং উদ্যোক্তাভিত্তিক অর্থনীতির কথা বলা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমান লন্ডন থেকে ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের কর্মসূচি ঘোষণা করেন, যেখানে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।

দলটির নেতারা বলছেন, “এই ৩১ দফা শুধু বিএনপির নয়, জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক শক্তির জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম।”

বিএনপির সাংগঠনিক বার্তা: ‘দল নয়, দেশ আগে’

বিএনপি বলছে, জিয়াউর রহমানের সেই অমোঘ বাণী—“ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়”—এই ইশতেহারের ভিত্তি। তারা চায়, ক্ষমতায় গেলে দেশ গঠনের কাজে নীতি ও মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেওয়া হোক। আর সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই এবারের ইশতেহারে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি সমন্বিত রূপরেখা।

ইশতেহার কমিটির কাঠামো

ইশতেহার তৈরির জন্য গঠিত কমিটিতে রয়েছেন:
– স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান
– চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহ
– মাহদি আমিনসহ বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবীরা

এই কমিটি খসড়া তৈরি করে স্থায়ী কমিটির কাছে উপস্থাপন করবে। স্থায়ী কমিটি তা অনুমোদন করার পর চলতি মাসের শেষ দিকে জনসম্মুখে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।

এবারের ইশতেহার কেবল প্রতিশ্রুতির একটি দলিল নয়—বিএনপি বলছে, এটি এক নতুন রাজনৈতিক চুক্তি। যেখানে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কেমন হবে—তার পূর্ণ নকশা তুলে ধরা হবে। তরুণ প্রজন্মের চাহিদা, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাব, জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নীতির সমন্বয়ে ২০২৬-এর ইশতেহার হতে যাচ্ছে বিএনপির রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের এক ঐতিহাসিক দলিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *