মনোনয়োনেই বামদের দুরাবস্থা, অর্ধেক আসনেও প্রার্থী দিতে পারল বামদের জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট

প্রথমে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র ১১৮টি আসনে প্রার্থী দিতে সক্ষম হয়েছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট (Democratic United Front)। ৯টি বাম দল নিয়ে গঠিত এই জোটের ৯৪টি আসনে একক প্রার্থী চূড়ান্ত হলেও ২৪টি আসনে সমঝোতা না হওয়ায় একাধিক প্রার্থী থেকে গেছে। এ অবস্থায় জোটের সাংগঠনিক প্রস্তুতি, রাজনৈতিক কৌশল ও বাস্তবমুখী নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে।

গত ২৯ নভেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে এক জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে যুক্তফ্রন্ট। ‘একসঙ্গে আন্দোলন ও নির্বাচন’ স্লোগানে গঠিত এই বৃহত্তর বাম জোটে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী), গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ, সমাজতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ, বাসদ-মাহবুব এবং সোনার বাংলা পার্টি।

তথ্য অনুযায়ী, সিপিবি দিয়েছে ৬৩ জন, বাসদ ৩৯ জন, বাসদ (মার্কসবাদী) ৩২ জন এবং বাংলাদেশ জাসদ ১৫ জন প্রার্থী। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা শেষ মুহূর্তে প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত বৃহত্তর ঐক্য গঠন হয়নি। ফলে মূলত বামজোট ও বাংলাদেশ জাসদ মিলেই নির্বাচনী লড়াইয়ে মাঠে নেমেছে।

১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত সংসদীয় রাজনীতিতে বাম দলগুলোর অংশগ্রহণ ও অর্জনের পরিসংখ্যান বেশ হতাশাজনক। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সিপিবি ও কয়েকটি দল একটি করে আসনে জয় পেলেও পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনে তারা ক্রমাগতভাবে ভরাডুবির মুখোমুখি হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে ২৩৭ জন প্রার্থী দিয়েও কেউই বিজয়ী হতে পারেননি। ২০০৮ সালেও সিপিবি-বাসদ সম্মিলিতভাবে মোট ভোটের ০.৬ শতাংশ পান। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে।

ভেতরের কোন্দল ও কৌশলগত ভিন্নতার কারণে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে না ওঠার অভিযোগ উঠে এসেছে জোটসংশ্লিষ্ট নেতাদের কথায়। একাধিক নেতার মতে, একদিকে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ঘাটতি, অন্যদিকে ‘বাম’ শব্দ ঘিরে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা ঐক্য গঠনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ নেতা বলেন, “যতটুকু ঐক্য গড়ে উঠেছিল, সেখান থেকেও পশ্চাৎপসরণ দেখা গেছে।” তার মতে, জনগণের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত ও সুসংগঠিত পরিকল্পনার অভাবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।

জোটের আরেক নেতা বলেন, “আন্দোলনে ঐক্য থাকলেও নির্বাচনী কৌশলে নেই। অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও অসংগঠিত মানসিকতা বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।” গাইবান্ধা, খুলনা, ঢাকা-১৫ ও বরিশালের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতেও যৌথভাবে সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি বলেও জানান তিনি।

সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, “আমাদের কাছে আন্দোলনই মুখ্য, নির্বাচন তার একটি ধাপমাত্র। আমাদের রাজনৈতিক লড়াই এখনো অনেক দূর যেতে হবে।”

বাসদ (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক মাসুদ রানা বলেন, “কিছু আসনে ঐক্যমত্য না হওয়ায় আমরা সবাই মিলে প্রার্থী দিতে পারিনি। তবে যেসব আসনে ঐকমত্য হয়েছে, সেখানেই আমরা জোটগতভাবে লড়ছি।”

বাসদের সাধারণ সম্পাদক ও বাম জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ জানান, প্রার্থী কম হওয়ার পেছনে মূল কারণ অর্থসংকট ও প্রস্তুতির অভাব। কনভেনশনের পরপরই তফসিল ঘোষণায় সময় সংকটের পাশাপাশি জামানত বৃদ্ধির বিষয়টি আর্থিক চাপে ফেলে দলগুলোকে। অনেকেই শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

তিনি বলেন, “আমাদের একটা দুর্বলতা হলো, আমরা অনেক সময় নির্বাচনকে অতটা গুরুত্ব দিই না। এটা দুর্বলতা, যা কাটিয়ে ওঠা উচিত।”

রাজপথে সক্রিয় থাকলেও নির্বাচনী ময়দানে বামপন্থিরা এখনও নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারেনি। আর এ চিত্রে স্পষ্ট হচ্ছে—আন্দোলনের কৌশল আর নির্বাচনী বাস্তবতা এক নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *